শিরোনাম

শ্রমিকদের জীবন নিরাপত্তা প্রদান করা শিল্পের স্বার্থেই প্রয়োজন

desh-mayএড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল: যে কোন অপরাদের বিচার ও শাস্তি না হলে ঐ অপরাদের পুরনাবৃত্তি ঘটে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সকল মৌলিক অধিকারের চেয়েও প্রধান মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে আর্টিকেল ৩১, ৩২, ৩৪ এ প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার এবং জবর দস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করণের বিষয়ের সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ্য আছে। এগুলো ইউনিভার্সেল হিউম্যান রাইট এবং মানবাধিকার সনদেও উল্লেখ্য। যাদের বা যার কারণে অপর কোন মানুষের প্রাণহানী ঘটে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনত ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে উপযুক্ত ভূমিকা বা কার্যকর হয়ে না উঠলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। তৈরী পোষাক শিল্প কারখানায় এ পর্যন্ত ২৩৫ টি অগ্নিকান্ড বা ভবন ধ্বসে প্রায় ২ সহশ্রাধিক মর্মান্তিক মৃত্যু এবং কয়েক হাজার পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। উল্লেখ্যযোগ্য কয়েক ঘটনার জন্য সরকারীভাবে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এসব ঘটনা বা শ্রমিকদের প্রাণহানীর জন্য মালিক সংগঠন এবং আই.এল.ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রদানে কম-বেশী দেয়া না দেয়া বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এক ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সব কিছু ধুয়ে মুছে দেয়ার কারণে শ্রমিকদের প্রাণ হানিও কমেনি ভবন ধ্বস-অগ্নিকান্ডও রোধ হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রাণহানির জন্য আইনগত শান্তির বিষয় নিয়ে কতটুকু ব্যবস্থা নেয়া গেছে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন? অগ্নীকান্ড ও ভবন ধ্বসের ঘটনার উপোর্যপরি  পুনরাবৃত্তি তাজরিন গার্মেন্টস অগ্নীকান্ড এবং রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা ঘটে গিয়েছে। একজন মানুষের প্রাণ হানির অপরাদের জন্য যাবৎজীবন কারাদন্ড-ফাঁসির আইন থাকলেও শত-সহশ্রাধিক মানুষের প্রানহানির অপরাদের জন্য প্রচলিত আইন দ্বারা বিচার করা সম্ভব নয়। leber 1আইন বিশেষজ্ঞদের মতে যখন এদেশে প্রচলিত আইন তৈরী করা হয়েছিল তখন এক সঙ্গে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বা এ ধরনের ধারণাও ছিলনা। এ সমস্ত ঘটনা এবং প্রাণহানির জন্য আইন সংশোধন পূর্বক বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে এগুলোর বিচার করা প্রয়োজন বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ ধরনের আইন প্রণয়ন না হলে অপরাধ মুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। শিল্প মালিক বা নিয়োগ কর্তা এমন ঝুকিপূর্ন কর্ম পরিবেশ বজায় রাখতে পারেন না যা দ্বারা অন্যের ক্ষতি বা প্রাণহানী ঘটতে পারে এবং যে ঘটনা বা অবহেলার জন্য তিনি দায়ী হতে পারেন। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য গার্মেন্টস শিল্প একটি গ্লোবাল চেইন সিস্টেম বিজনেস, এই প্রেক্ষিতে বিদেশী ক্রেতা বা ব্রান্ড বায়ার যারা তাদের ব্যবসায় মুনাফার প্রয়োজনে আমাদের দেশে উৎপাদন করে থাকে এক্ষেত্রে ব্রান্ড-বায়ারদেরও কর্পোরেট সোস্যাল লাইবিলিটি রয়েছে। পৃথিবীতে প্রায়ই দেখা যায়, কোন বহু জাতীক কোম্পানী বিভিন্ন দেশের খনিতে উৎপাদনের সময় দূর্ঘটনা বা প্রাণহানির জন্য তার ক্ষতিপূরন প্রদান করে থাকে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্রান্ড-বায়ার যখন আমাদের দেশে কোন কাজের অর্ডার দিবে তখন শ্রম মন্ত্রণালয়ে অবশ্যই হলফ নামা দিয়ে বলতে হবে তাদের অর্ডার প্রাপ্ত কারখানা নিরাপদ কর্ম পরিবেশ রয়েছে এবং যে কোন দূর্ঘটনার জন্য তারা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য এছাড়াও দেশীয় শিল্প মালিকগণ আদালতে এই মর্মে ডিক্লেয়ারেশন প্রদান করবেন যে, কারখানা আইন ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ক্রটির জন্য দায়ী থাকবেন। বিলিয়ন ডলারের এ ব্যবসায় মুনাফা অর্জনকারী মালিকপক্ষ আর অন্যদিকে তাদেরই শ্রমিক যাদের মেহনত ও দক্ষতা নির্ভর করে পোশাক শিল্প টিকে আছে, সেই শ্রমিক কর্মস্থলে জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। lebar 1এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবন নিরাপত্তা প্রদান করা গার্মেন্টস শিল্পের স্বার্থেই প্রয়োজন। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যতীত গার্মেন্টস শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব নয়। শ্রমিকদের আগুনে পুড়ে অথবা শ্রমিকদের রক্ত দিয়ে বানানো পোশাক সাধারণ ক্রেতারা ব্যবহার করেন না। বিজিএমইএ-মালিক পক্ষ তাজরিন বা রানা প্লাজা ঘটনার বিচার বা শাস্তির বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার পলিসি প্রমান করে তারা ঘটনার বিচারে আগ্রহী নয়, কারণ উক্ত ঘটনার দেলোয়ার হোসেন, রানার মৃত্যুদন্ড হলে পুনরায় যখন আবার কোন ভবন ধস বা অগ্নীকান্ড ঘটবে তখন তারও বিচার হবে। এখন পর্যন্ত অগ্নিকান্ড ও ভবন ধ্বসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এমন কোন দৃষ্টান্তমূলক বিচার বা শান্তি দেখতে পাওয়া যায়নি, যার দ্বারা শ্রমিক বা ক্রেতাগণের মধ্যে আস্তা সৃষ্টি হতে পারে। বিজ্ঞ জনেরা মনে করে, গার্মেন্টস শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে দেশের স্বার্থে। তবে কোন শোষণ বা শ্রমিকের লাশের উপর এই শিল্পের অগ্রগতি হবে না। উপুক্ত ক্ষতিপূরণ দায়ী-দোষীদের শাস্তি, ন্যায় বিচার ও নিরাপদ কর্মস্থল সবাই আশা করে। মহান মে দিব অমর হউক। ##

এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল:
সভাপতি
বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: মুক্ত কলাম, রাজনীতি

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*