শিরোনাম

রাষ্ট্র, ধর্ম, নিরপেক্ষ এবং ইসলাম

2016_03_29_12_37_58_y3HdPBUIpD8BHCd8aFlfIFUn9fVu9z_originalহাল আমলের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং প্রতিপক্ষ সেকুলারিজম যার অনুবাদ পাওয়া যায় তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা। এদের মধ্যকার যে চলমান বিরোধার্থক অবস্থান আমরা দেখতে পাই সেটা আসলে কোন অবস্থাতেই মূল সমস্যার দিকে নজর দিতে দেয় না। আমরা বলতে চাই অর্থাৎ ‘স্কুল অব দ্য পিপলস’ মনে করে রাষ্ট্রধর্মের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার বিভেদ নেই বরং বিরোধটা আসলে জাতীয়তাবাদের কুঠুরীতে। কারণ আমাদের কাছে ধর্ম হঠাৎ করে খারিজ করে দিয়ে নব্য উপনিবেশিক চিন্তা কাঠামোর খুপরিতে ঢোকা নয়, অথবা ধর্মকে পরকালীন সিলসিলা বানানোর ধান্ধা নাই। এই আলোচনা করতে গেলে আমাদের কাছে পরিচিত যে শব্দগুলো বারবার ঘুরে আসবে তা হল, রাষ্ট্র, ধর্ম, নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ।

বঙ্গের পরান সন্তান আদি নারায়ণী সমাজ ব্যবস্থার উপর আর্যগণের হামলার ফলে যারা বা যে সকল কওমগন নমশূদ্রে পরিণত হলেন তারাই বর্তমান বাঙ্গাল রাষ্ট্রকাঠামোতে বসবাস করছে। তাই এখানে এটা মনে রাখা দরকার যে, বাঙলা কোন ভাষাবাদী জাতিরাষ্ট্রের নাম নয়। এটা একটা স্থানসম্পর্কিত গোষ্ঠির আবাসস্থল। ‘বঙ’ মানে জলাশয়, এবং এই বঙ থেকেই বাঙলা। এবং বঙ এর অধিবাসীরা যে ভাষায় ভাব প্রকাশ করে, তারে কয় বাঙলা ভাষা। তাই সেই পথ ধরে বর্তমান বাংলাদেশ সেই বঙদের চিন্তাকে রাষ্ট্রকাঠামোতে নিয়ে আসবে এটাই আশা করা যায়। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রব্যবস্থার খুঁটি ঔপনিবেশিক ওরিয়েন্টালইজমের কোল ঘেঁষা। সেটা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক হোক, ধর্মতাত্ত্বিক হোক, মানুষতাত্ত্বিক হোক কিংবা নাগরিক আচরণেই হোক। রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে চতূর্বর্ণ প্রথাকে দায়েম রেখে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা আবার মানবাধিকারের বক্তৃতা প্রচার করে এবং মানবাধিকারের ঔরসে পয়দা হয় সন্ত্রাসবাদিতার সংজ্ঞা। আর তখনি দেখা যাবে, ঔপনিবেশিক প্রভুগন হামলে পড়বে কথিত সন্ত্রাসবাদী হঠাও এবং এই সন্ত্রাসবাদ আদতে কিভাবে সন্ত্রাসবাদ? কেন এদের হটাতে হবে? আর কেনই বা এরা সন্ত্রাসবাদী হল? এই প্রশ্নের জবাব কিন্তু পাওয়া যাবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার নিজস্ব সংজ্ঞা মতে। সেই সংজ্ঞা আবার কলোনিয়াল জ্ঞানের আলোকেই। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোনভাবেই আদি নারায়ণীদের সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে এখনো দাঁড়াতে পারে নি।

এই নয়া আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বুনিয়াদ দিয়েছে পুঁজি নিজেই। আর তা হল, দেশপ্রেম (কাঁটাতারে আবদ্ধ প্রেম)। পুঁজির এই নয়া জামানার আধুনিকায়নের শিক্ষা হল, ‘অবশ্যই আপনাকে হতে হবে একজন অনুগত নাগরিক’ । কিন্তু আদি নারায়ণী সমাজ ব্যবস্থা এখানে প্রশ্ন তোলে, যদি প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থেকেই থাকে তাহলে রাষ্ট্র থাকলেই থাকবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ক্ষমতা কথা বললেই জেহাদ কথা বলবে ধর্ম ও ধর্মদ্রোহিতা একই সময়ে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় চলতে বাধ্য। কিন্তু নয়া জাতীয়তাবাদ কোনরূপ দ্রোহ মানে না, তাই ধার্মিক জাতীয়তাবাদকে দেখি ধর্মদ্রোহীর কল্লা চায় আর রাষ্ট্রদ্রোহী হলে রাষ্ট্র দেয় ফাঁসি। এখানে ধার্মিক জাতীয়তাবাদ বলতে শরিয়তি আচারকেন্দ্রিক অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানিক আইনপন্থি ধারাকে বুঝাচ্ছি। এই ধারার বাইরে থেকে যারা ধর্মকে দেখেন তারা কোন প্রকার জাতের মাতবরি করেন না। বঙ্গে এই পন্থিদেরকে আপনি এখনো পাবেন। যাদের প্রায়শই বিভিন্ন জাত এবং সাথে রাষ্ট্রজাতের কওমেরাও হামলা করেন। রাষ্ট্রজাতিকরা আসে ঐতিহ্যের ন্যাকামো সহকারে আর অন্যান্য জাত আসে দলীয় কিংবা বিদলীয় করণ নীতিমালা নিয়ে।

আমরা এখন বুঝতে চেষ্টা করব ধর্ম নামে যে শব্দটা শুনি এবং তার করণ ক্রিয়ার সাথে আমরা অভ্যস্ততার লেবাস বুঝতে। অতএব তার জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং ক্ষমতা ও উপনিবেশিক জাতীয়তাদের সংজ্ঞা ও নমুনা আমাদের দেখা উচিত অপারেশন টেবিলে রেখে। যেহেতু আমরা এই আলোচনায় ইসলামের একটা যোগাযোগ আছে মাথায় রেখেই এসেছি, অতএব আমাদের সেখানে ইসলামী পরিভাষা থাকবে সেটা বলা যায়। তবে এর দ্বারা অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায় স্ব স্ব প্রতীক সহকারে আছেন তাদেরকে চেনা যাবে। ধর্ম মূলত ধৃ ধাতু থেকে ধারণ রূপ নিয়ে জন্মেছে এবং পদার্থের নিজ নিজ ধারণ ধরন ও ক্রিয়া করণের মধ্যে দিয়া বেড়ে ওঠে বলেই মনে করেন ধর্মের পথে যারা নাগরিক লালসা হারাইছেন। অর্থাৎ পদার্থের স্ব স্ব ইন্দ্রিয় যোগী প্রেরণা সহকারে ধর্ম আসে। মোদ্দা কথা হইল, ধর্ম মানেই প্রকৃতি। ধার্মিকেরা বলছেন, ধর্মহীন মানে প্রকৃতি থেকে পুরুষে উন্নীত হওয়াই হইল মানবের ধার্মিক জীবন। অর্থাৎ আপনি স্বভাবের কুভাব সহকারে থাকবেন না, কেবল আপনি হবেন স্বভাব নিরপেক্ষ। অর্থাৎ এই পদে এসে সে যখন আমাদের বানী দান করেন সেটা নানা নামে আমাদের সামনে আসে। যেমন, কোরান ,গীতা, বাইবেল কিংবা কোনো আত্মমগ্ন ফকিরের কালাম।

কিন্তু আমাদের দশা চিরকালই এই যে, যেহেতু জ্ঞানকে ব্যক্তির মাধ্যমে পেয়েছি তাই বলে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত রুচিবোধ দিয়া বিচার করব কেবল সেটা অযৌক্তিক বলে মনে করছি। কারণ যে ব্যক্তিকে আমরা জ্ঞান করছি তার নিজস্ব একটা যাত্রাপথলব্দ অভিজ্ঞতা আছে। সেই পরিমাণ অভিজ্ঞ না হয়ে প্রাপ্ত বানীর মূল বয়ান বোঝা যাবে না বলে আমরা মনে করছি। এই রিপুহীন, স্বভাবহীন, ধর্মহীন নিরপেক্ষ সত্ত্বার মানবকেই আমরা বলি ‘স্বামী’। অর্থাৎ কর্তৃত্বপরায়ণ যিনি ‘স্ব আমি’ দর্শন করে স্বামীভাবে আছেন। তবে আমরা একথা বলছি না যে ভাব আর ভাবনা জুদা। কারণ ভাব ভাবনার শরিরে জন্মায় আবার ভাবনা বিনাশ হয়ে ভাবই কেবল পাওয়া যাবে এই কথা নদীয়ার পুরানা কথা। ভাব ও ভাবনার এই যুগল ভজন নদীয়ার দর্শনিক পরিমণ্ডলে হামেশাই পাওয়া যাবে। লালন ফকির বলছেন , ‘নবীর ডঙ্কা বাজে শহর মক্কা মদীনে, আয় কে যাবি নবীর দ্বীনে’ অথবা ‘ধন্যরে ভারতী যিনি সোনার অঙ্গে দেয় কৌপিনী/ শিখাইলে হরির ধ্বনি / করেতে করঙ্গ দিলে।’ অর্থাৎ নদীয়া কেবল ভাব না স্থানের যে রাজনীতি আছে তার বাইরে গিয়ে নয় এর মধ্যেই ভাবের চালনা করতে পারলে খুশি।

এতক্ষণ ধর্মের পরিচয় খোজার নামে যা করেছি বলেছি সেটা ধর্মের জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্থাৎ পদ ও পদার্থের বেগ আবেগ সহযোগে জ্ঞানতাত্ত্বিক তরিকায় বলতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র কিম্বা সমাজের যে স্থূল চাহিদা এবং সাপ্লাইয়ের ধারা আছে তাকে আপনি জ্ঞানতাত্ত্বিক বানী শোনাতে পারবেন না। কিন্তু এরা আপনাকে ঠিকই স্থূল সংজ্ঞা কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ বাতলে দিবে। অর্থাৎ ধর্মকে স্রেফ বস্তুর আলোকেই দেখতে চাইবে। কিন্তু একথা বলছি না ধর্মকে বস্তুর আলোকে দেখা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে সত্যকে কি বস্তু আকারে দেখা যায়? নাকি বস্তু নিজেই সত্য হয়ে উঠলেই সত্য কে চিনতে পারবে? মূল কথাটা হল, বস্তুবাদী সমাজ ব্যবস্থা কেবল আছে আছির মধ্য দিয়া ধর্মকে বা ঈশ্বরকে কিংবা চিন্তা এবং চেতনের হাল দেখতে অভ্যস্ত। আপনি যখন বলেন, ঈশ্বর আল্লা ভগবান আছেন। তখন এই ‘আছেন’ কথাটি আপনার মধ্যে ‘আছে’ বলতে যে বস্তুময় অবস্থার অভিজ্ঞতা আছে তার ভিত্তিতেই বলছেন। কিন্তু আল্লাতো বলছে সে নিরাকার। এখন এই নিরাকারকে আপনি সাকার যোগে কিভাবে ‘আছেন’ বলেন? আবার আপনি যখন বলেন, ঈশ্বর আল্লাহ ভগবান বলতে কিছু নাই। তাইলে এই যে নাই বলছেন, তা অবশ্যই কোনো আছেকে কেন্দ্র করে। কারণ সাপেক্ষ ছাড়া আপনি খারিজ করতে পারেন না, সেই অভিজ্ঞতা আপনি এখনো অর্জন করেন নাই। তার মানে আপনার ‘নাই’ এরও একটা ‘আছে’ অবস্থা আছে। কিন্তু আপনারা খেয়ালে রাখছেন না যে, ‘আমি সাক্ষ্য দিতেছি আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই’, এই কলেমা আমার আপনার সামনেই আছে। কলেমায় শাহাদাতের দিকে কড়া নজর রাখুন। দেখুন আপনার সাক্ষ্য ছাড়া কোনো মাবুদ, আপনার উপর মাবুদগিরি করার থাকে না। কিন্তু আপনি যে সাক্ষ্য দিচ্ছেন আপনার কি তার সাথে সাক্ষাত হইছে? বিনা সাক্ষাৎ ছাড়া আপনি সাক্ষ্য দেন কিভাবে? অর্থাৎ আপনি নিজে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা মোহাম্মদের ইসলামই হোক কিম্বা ফকিরের ফিকিরি ধারায়।

ফকিরের বয়ানে পাই, ‘আমি যেই রূপ/ দেখনা সেই রূপ দ্বীনদয়াময়/ দ্বীনদয়াময়’ অর্থাৎ আত্মসত্ত্বার দর্শনের মধ্য দিয়ে সত্য দর্শন নয়, স্বয়ং সত্য হবার দিকেই নদীয়ার ঝোঁক। ধর্মের যখন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের রূপ লাভ করে তখন ধার্মিকের অনুসারীদের মধ্যে কর্তা এবং কর্তৃত্বের যোগে একজাতীয় জাতীয়তাবাদী নীতিতাত্ত্বিক আচরণ পাওয়া যাবে। এজন্য দেখা যাবে আরব থেকে যে ইসলাম হিজরত করে বঙ্গে এসেছে সেখানে আরবীয় জাতীয়তাবাদের পতাকা উড়ানো ছাড়া সামাজিক জীবনে আর কোন প্রভাব রাখেনি। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম দুই তরিকার এসেছে, একটা পথ আরবের মরুবালু সহকারে যুদ্ধের আর দখলের পয়গাম নিয়া আর অন্য দলটা এসেছেন এর জ্ঞানতাত্ত্বিক এলেম, আমল ও কামেলিয়াত নিয়া। আরবিয় জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহীদল তাদের কোমর শক্ত করতে পেরেছে এখানে তা খুব একটা বেশি দিন আগে নয়। অর্থাৎ মক্কার আবদুল ওহাবের ওহাবী মতবাদ এদেশে ব্রিটিশ আমলে মীর নিসার আলী ওরফে তীতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, আলীগড় আন্দোলনের সৈয়দ আমীর আলী এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার উত্থানের মধ্য দিয়ে হয়েছে। মনে রাখা দরকার দেওবন্দ মাদ্রাসা চালু করেন ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি এবং এর প্রথম প্রিন্সিপাল একজন ইংরেজ সাহেব। অন্যদিকে আলীগড় আন্দোলন মুসলমানদের যে জাগরণের কথা বলা হয় সেটা আসলে পুরাপুরিই ভুয়া সংবাদ, কারণ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ইংরেজ উপনিবেশিক জাতীয়তাবাদীর ভাষা ইংরেজি বলাকে জাগরণের কিচ্ছা আমাদের জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের দল।

পূর্ব বাঙলার বাঙালি কৃষক কিংবা আতরাফ মুসলমানের শেষ পরাজয় এই বিশ্ববিদ্যালয় করায়। এরাই এখানে চালু করেছে কট্টরপন্থা, জাতিভেদ প্রথা, এবং আচরণ অনুষ্ঠাণবাদী ধর্মীয় জ্ঞান। এর রাষ্ট্রতাত্ত্বিক কাঠামো আরবিয় এবং ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের কপি পেস্ট ছাড়া আর কিছুই না। অর্থাৎ ইসলাম নামে শব্দে আচরণে অনুষ্ঠানে অভ্যাসে চিন্তায় রাষ্ট্র ও সমাজে কায়েমি লেবাসে যেটা পাই সেটা ওহাবী বা স্রেফ শরিয়তি (আইন) কিংবা স্থানবাদী জাতীয়তাবাদের জাতের প্রচারণা। অর্থাৎ ইসলাম এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের মুখোমুখি জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবে হয় নাই। কিন্তু ইসলামের যে বয়স এখানে, তাতে নিশ্চিতভাবে আশা করা যায় বঙ্গের ঘ্রাণ তার শরীরে পাওয়া যাবে। বঙ্গীয় জ্ঞান নিয়েই যদি ইসলামকে এখন পাইতে পারার কথা হলে সেখানে ইসলামকে কেন রাষ্ট্রধর্ম লড়াইয়ে খোদ বঙ্গের বিপক্ষেই যেতে হবে? কারণ বঙ্গের এই যে বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর চিন্তা তাতো বঙ্গের আদি থেকে উৎসরিত না। বাংলাদেশ এখন যে পথে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াইতে চায় সেটা বঙ্গের স্থানীয় জাতীয়তাবাদের দুই পায়ে না, সেটা ইউরোপীয় এনলাইটমেন্ট ধারনাকে স্থির এবং জ্ঞানবাদীতা মনে করে। যার ফলাফল ভাল না। কারণ পোষ্ট কলোনিয়াল পিরিয়ডের পর আমাদের কলোনির স্বভাব দূর না হয়ে বরং নয়া পশ্চিমা জাতীয়তাবাদী উপনিবেশিক আশ্রয়কামী হচ্ছি। এর বড় ক্ষতি হচ্ছে, নয়া সাম্রাজ্যবাদীতার, সন্ত্রাসবাদ হটাও নামক স্লোগানে সাড়া দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের হিস্যা হওয়া।

আমরা মনে করি, ইসলাম এই ব্যাপারে তার জন্মলগ্নেই সচেতন ছিল এবং এখনও আছে তবে তারা সাবঅল্টার্ন খেতাব যোগে আছে। এই যে রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের বিরোধ দেখি সেটা ইসলাম ধর্মের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার সংঘর্ষ নয় এটা আরবিয় ইসলামী জাতীয়তাবেদের সাথে বাঙ্গালি বা বাংলাদেশীয় জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষ। অর্থাৎ সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যকার ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র সাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মারামারি নাই কারণ খোদ ইসলাম নিজেই একটা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা ব্যবস্থা। কারণ স্বভাব নিরপেক্ষতা ছাড়া শিরকই মুক্ত হওয়া যায় না বলেই ঘোষণা করে ইসলাম। সংবিধানের অপর মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথেই ইসলামি জাতীয়তাবাদের বা কথিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের দ্বন্দ্ব। এখন কথা হচ্ছে, বাঙ্গালরা কি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং এই যে স্থান কাল জাতের খবরদারিতাকে মানে? আমার মতো অজ্ঞানী লোকের নজরে কাছাকাছির মধ্যে বাঙলার যে চিন্তা কাঠামো পাই সেটা নদীয়ার চিন্তার দর্শন আর নদীয়া তার জাত গোত্র বর্ণ আর লিঙ্গের ভেদ জ্ঞানের বিরুদ্ধেই তার চিন্তার স্লোগান দিয়েছেন। অতএব, বাঙালির নয়া জাতীয়তাবাদী আচরণ ইউরোপকে নকল করে হয়েছে, বঙ্গের শিকড় থেকে নয়।

বিচারকের দরবার থেকে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে করা রিট খারিজ হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকবে। কিন্তু কথা হল ধর্ম হিসেবে ইসলাম নিজেরই তো একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা আছে, তার শরিয়তি আইন আছে এবং কোরানকে সংবিধান মানার ব্যাখ্যা শরিয়তি আলেমের কাছে শোনা যায় এবং শরিয়ত মতে কোরান ছাড়া অন্য বিধান ইসলামিক নয়। তাইলে খোদ মানুষের তৈরি সংবিধানে কেন ধর্ম হিসেবে ইসলাম অন্তর্ভূক্ত করতে হবে? যেখানে শরীয়তের মতে কোরান ছাড়া অন্য কোনো আইন মানা ইসলামসম্মত নয় সেখানে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখার জিহাদ কতটা ঈমানের পরিচয় বাঙ্গালি মধ্যশ্রেণী মুসলমান সমাজের কাছে সেই প্রশ্ন রইল, আশা রাখি জবাব পাব। আমরা একই সাথে বলতে চাই, পশ্চিম দেশের এনলাইটমেন্টকে আদর্শ জ্ঞান করে বঙ্গের যুগ নির্বাচন করাটা এবং তার মান নির্নয় করাটা মূর্খতা এবং উপনিবেশিক দালালীপনা ছাড়া আর কিছুই না? এখানে নাস্তির জ্ঞান দিয়ে শুরু হয় ধর্মের বয়ান। বঙ্গে ঈশ্বর, ধর্ম, আইন এবং আচারের আলোচনার পদ্ধতি বিষয়ক তাত্ত্বিক আলোচনা নৈয়ায়িক এবং নব্য নৈয়ায়িক কালেই হয়েছে। শ্রী গৌরাঙ্গের কালে তার প্রয়োগের মাধ্যমে এইখানে চিন্তা ব্যবস্থাপনার যে দার্শনিক ধারাবাহিকতা চলছে তাকে অবজ্ঞা করে বঙ্গীয় চিন্তা পদ্ধতি বোঝা যাবে না।

আমরা মনে করি, রাষ্ট্র কাঠামোর কাজ হচ্ছে নাগরিক এবং তাদের গোষ্ঠীদের মধ্যকার বিরোধের নিষ্পত্তি করণকল্পে রাষ্ট্রের ভূমিকা মধ্যস্থতাকারীরুপে নিরপেক্ষ সালিশের ব্যবস্থা করা এবং সে কোন পক্ষভুক্ত হয়ে বর্ণতাড়িত হবেন না এটাই নাগরিকের কামনা। তাই রাষ্ট্রকে হতে হবে স্বভাব নিরপেক্ষ এবং সেই রাষ্ট্রই চিন্তা এবং চেতন, ভাব এবং ভাবনার মিশেল ঘটাতে সক্ষম হবে বলে আমাদের ধারনা এবং প্রার্থনা। লালন ফকিরের জবান শুনে শেষ করব, ধর্ম কর্ম আপনার মন/ করে ধর্ম সব মোমিনগণ/ লালন বলে ধর্মের করণ/ প্রাপ্তি হবে নিরঞ্জন/ সবে কি হবে ভবে ধর্ম্পরায়ণ/ যার যা ধর্ম সেই সে করে/ তোমার বলা অকারণ।।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: জাতীয় খবর, প্রধান খবর - ১, মুক্ত কলাম

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*