শিরোনাম

বিএনপির ষষ্ঠ সম্মেলনের মূল্যায়ন বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে

12814361_961952373854248_6756964573380935663_n১৯ মার্চ ঢাকায় বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন হলো। সর্বশেষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। তখন বিএনপি ছিল সংসদে প্রধান বিরোধী দল। এবার নানা কারণে দলটি ব্যাকফুটে। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রটি ব্যবহারের অনুমতি এবার তারা পায়নি। সম্মেলন হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে। এতে অবশ্য জাঁকজমকের কমতি ছিল না।
বেশ কিছুদিন ধরেই সম্মেলনের জায়গা পাওয়া নিয়ে দলের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। সম্মেলন আদৌ তারা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিএনপির কয়েকজন নেতা আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। শেষমেশ সম্মেলনটি হলো নির্বিঘ্নে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, ‘বিএনপিকে অতীতের ভুল রাজনীতি শুধরে আসার জন্যই সুন্দরভাবে কাউন্সিল করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তারা এই সুযোগের অপব্যবহার করলে কঠোর হস্তে তা দমন করা হবে।’ এ কথা শুনে মনে হতে পারে, কাউন্সিলটি করা গেছে সরকারের বদান্যতায়। অর্থাৎ, কোনো দল তাদের সম্মেলন করতে পারবে কি পারবে না, তা সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করে। ইমাম সাহেবের কথায় সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ল না কমল?
সম্মেলন নিয়ে বিএনপি নেতাদের নানা রকম কথাবার্তা শোনা গেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। বেশির ভাগ কথাই ঘুরপাক খেয়েছে কমিটি করা নিয়ে—কারা আসবে, কাদের আসতে দেওয়া হবে না ইত্যাদি। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়টি নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাননি। দলটি সংসদে না থাকলেও এটা যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ, তা তাঁদের কথাবার্তায় লুকানো থাকে না। আওয়ামী লীগের নেতারা কোথাও ১০ মিনিট বক্তব্য দিলে ৫ মিনিটজুড়েই থাকে বিএনপি প্রসঙ্গ। বিএনপিকে নিজের ঢোল বাজাতে হয় না, প্রতিপক্ষরাই বাজায় এবং প্রতিপক্ষের গালমন্দ দলটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আলোচনায় সে-ই আসে, যে গুরুত্বপূর্ণ—মিত্র কিংবা শত্রু।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিএনপিকে নিয়ে কেন এত মাতামাতি বা টানাহেঁচড়া। কারণ খুবই সোজা। দলটি এখন যতই নড়বড়ে হোক না কেন, এর পেছনে জনগণের একটা বিরাট অংশের সমর্থন আছে। ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে (৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে)। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা সবচেয়ে কম আসনে জয় পেয়েছিল, মাত্র ৩০টিতে। কিন্তু ভোট পেয়েছিল ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। জোটের রাজনীতির কল্যাণে জাসদ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ও ওয়ার্কার্স পার্টি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকারের অংশ হতে পেরেছিল। অর্থাৎ দেশের এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিএনপি থেকে গিয়েছিল ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও এ রকম ঘটনা ঘটেছিল। সেবার আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট বেশি পেলেও সংসদের আসনবিন্যাসে তার প্রতিফলন হয়নি। তা না হলে তাদের ২১ বছরের অপেক্ষার পালা ১৬ বছরেই শেষ হতো।

কথাটা এ জন্যই তুললাম যে যথেষ্ট জনভিত্তি থাকার কারণেই বিএনপিকে নিয়ে এত আগ্রহ, এত আলোচনা। দলটিকে বাইরে থেকে যত নাজুক মনে হোক না কেন, অনেক মানুষ একে আওয়ামী লীগের বিকল্প মনে করে। দলটি একাধিকবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার পরিচালনা করেছিল। ভবিষ্যতেও সরকারে যাওয়ার আশা রাখে। আওয়ামী লীগের নেতারা এটা বোঝেন বলেই কারণে-অকারণে বিএনপির প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সম্মেলনের আগেই দলের চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। কাউন্সিলে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে পারিবারিক পরম্পরা বেশ জেঁকে বসেছে। শিগগিরই এ থেকে মুক্তির উপায় দেখি না।

সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়ার নীতিনির্ধারণী ভাষণটি নানা দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জনগণের সামনে ‘দিন বদলের সনদ’ নিয়ে হাজির হয়েছিল, উপস্থাপন করেছিল ‘রূপকল্প ২০২০’। পরে সরকার তার মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় এটা গ্রহণ করে। বিএনপি এবার নিয়ে এল রূপকল্প ২০৩০। এ ধরনের একটি প্রস্তাব ও কর্মসূচি এর আগে বিএনপির কোনো সম্মেলনে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়নি। ১৯৭৭ সালের ২২ মে ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়’ নিয়ে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ১৯ দফা কর্মসূচিকে গ্রহণ করেছিল। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর দলটি নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।

বেগম জিয়ার এই রূপকল্প ২০৩০ মোটা দাগে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন সংবিধানের ব্যাপারে মৌলিক কয়েকটি প্রস্তাব, দেশ পরিচালনা ও সুশাসন সম্পর্কে কিছু কথা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে কতিপয় সুপারিশ। তিনি যে গা গরম করা একটা মেঠো বক্তৃতা দেননি, সে জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাই।

তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই পদের মাজেজা তিনি বোঝেন। তারপরও তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করেছেন। এ বিষয়টি নিয়ে ১৯৭২ সালে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। ১২ অক্টোবর (১৯৭২) গণপরিষদ সংবিধান বিল উত্থাপনের পর ১৬ অক্টোবর ন্যাপ (​মোজাফফর) প্রধানমন্ত্রীর হাতে ‘অযৌক্তিকভাবে অধিক ক্ষমতা অর্পণ’-এর বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছিল, ‘একক ব্যক্তির ইচ্ছা ও অনিচ্ছার ওপর এত অধিক নির্ভরতা সংসদের সার্বভৌমত্বের ওপর এবং সংসদীয় গণতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে একটি হুমকিও হতে পারে।’ (পীর হাবিবুর রহমান ও পঙ্কজ ভট্টাচার্যের বিবৃতি সংবাদ, ১৭ অক্টোবর ১৯৭২)। ১৮ অক্টোবর (১৯৭২) বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আইনসভা ভাঙ্গিয়া দিবার যে সকল বিধান রহিয়াছে, সেইগুলি গণতন্ত্রবিরোধী বিধান। এই বিধানগুলির ফলে রাজনৈতিক দলগুলির গুরুত্ব লোপ পাইবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপ তাঁহার রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত না হইয়া তিনিই বরং তাঁহার রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণ করিবেন।’ (সিপিবির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর বক্তব্য, সংবাদ, ১৯ অক্টোবর ১৯৭২)।

১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু হলে রাষ্ট্রপতি একক ক্ষমতার অধিকারী হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে দেশ ফিরে এলেও প্রধানমন্ত্রীর একচেটিয়া ক্ষমতার হেরফের হয়নি। বর্তমান পদ্ধতিকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা না বলে বরং প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার পদ্ধতি বলা যায়। বেগম জিয়া দেরিতে হলেও এর পরিবর্তন চেয়েছেন।

বেগম জিয়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা বলেছেন। এর পেছনে তিনি যুক্তিও দিয়েছেন। সমাজের বিভিন্ন অংশের, বিভিন্ন গোষ্ঠীর ‘মেধাবী’ মানুষের মতামতকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য তিনি এ প্রস্তাব করেছেন। এ কথাটি অবশ্য সিরাজুল আলম খান এবং আ স ম আবদুর রবের জাসদ ১৯৮৪ সাল থেকেই বলে আসছে। তাঁরা চান ২০০ আসনের একটা ‘উচ্চকক্ষ’-সংবলিত ৫০০ আসনের পার্লামেন্ট। এই প্রথম একটা বড় দলের প্রধান নেতার মুখে কথাটি উচ্চারিত হলো। এ নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক আলোচনা হওয়া দরকার।

বেগম জিয়া যেসব কথা বলেছেন, তার অনেকটাই আপ্তবাক্য, ভাসা-ভাসা ও স্লোগানধর্মী। এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দরকার। যেমন তিনি বলেছেন, ‘যথোপযুক্ত’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনটা যথোপযুক্ত? স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এটা করা হবে। কোন সালের মধ্যেই? আশা করব, বিএনপি এসব বিষয় আরও নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে পরিষ্কার একটা চিত্র তুলে ধরবে এবং শিগগিরই তা নির্বাচনী মেনিফেস্টো বা অন্য কোনো আচরণে জনসমক্ষে হাজির করবে।

বেগম জিয়া সরকারপ্রধানের ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলেছেন। যদি তিনি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেন, তিনি কি তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন? তাঁর ওপর কি আস্থা রাখা যায়? তাঁর অতীতের কর্মকাণ্ড তো তা বলে না। যদি তিনি সত্যি সত্যিই পরিবর্তনের কথা বলেন, তাহলে তাঁর উচিত হবে দলের ভেতর থেকেই তা শুরু করা। দেশের গণতন্ত্রায়ণের জন্য দলের গণতন্ত্রায়ণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দলে তাঁর একক ক্ষমতা—সেখানেও ভারসাম্য আনা দরকার।

বেগম জিয়া যা বলেছেন, তাতে নতুনত্ব আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নতুন রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাঁর দল মানসিক ও সাংগঠনিকভাবে কতটা তৈরি। নাকি এ সবই কথার কথা। রাজনীতির পালাবদল ঘটাতে হলে দলের খোলনলচে পাল্টে দেওয়া দরকার। কতটুকু পারবে বিএনপি? ২০১৪ সালের নির্বাচনে যাওয়া কিংবা না যাওয়া নিয়ে বিএনপি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। বিএনপির উপলব্ধি কী, তা জানি না। তবে এটা সত্য যে সরকার পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। পরবর্তী নির্বাচনযুদ্ধের জন্য বিএনপিকে তৈরি হতে হবে। বেগম জিয়ার এবারের বক্তৃতায় প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন নেই। এটা খুবই ইতিবাচক। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। হাসিনা-মার্কা নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।’ এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সহমত না হলে দেশ অবধারিতভাবে আবারও সংকটে পড়বে।

বেগম জিয়া ‘ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী’ রাজনীতির কথা বলেছেন। তিনি সামাজিক সনদের কথাও বলেছেন। তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতি তিনি যে সৎ ও আন্তরিক থাকবেন, সেই বিশ্বাসযোগ্যতা তাঁকে ও তাঁর দলকে আগামী দিনগুলোতে অর্জন করতে হবে। ##

(লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এর এই লেখাটির সঙ্গে আমি এক মত )
Be Sociable, Share!
বিভাগ: মুক্ত কলাম, সম্পাদকীয়

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*