শিরোনাম

একটি পতাকা, মানচিত্র আর একটি ভূখণ্ড আদায়ের লড়াই শুরুর দিন

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস, ২৬ মার্চ। একটি পতাকা, মানচিত্র আর একটি ভূখণ্ড আদায়ের লড়াই শুরুর দিন। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের দিন আজ। বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তির দিন। এদিন বাঙালি জাতির মুক্তি অর্জনের ইশতেহার ঘোষণার দিন। আজকের দিনে মুক্তিকামি একটি জাতি একটি স্বাধীন দেশ অর্জনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে ছিলো। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ওই রাতের প্রথম ভাগে শেখ মুজিব টেলিফোনের মাধ্যমে সেন্ট্রাল ‘টিএন্ডটি’ অফিসের এক বন্ধুর কাছে পৌঁছে দেন স্বাধীনতার অমোঘ বাণী। যে বাণী নানা মাধ্যমে সে রাতেই এবং পরদিন প্রত্যুষে চট্টগ্রামসহ সারা বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই ওই বন্ধুটি টেলিফোনে জানিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধু স্বঘেষিত স্বাধীনতার বাণী। ইংরেজিতে করা ওই ঘোষণার বাংলা অনুবাদ হলো- এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি।’ চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বাংলায় যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন সেটি হলো, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি।’ এর পরপরই পাকিস্তানিদের পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। শুরু হয় স্বাধীকার অর্জনের লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ৭১’র ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এদিক থেকে মার্চের ২৬ তারিখ মূলত আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিন। মূলত পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের গণহত্যার জবাব দিতেই পূর্ববাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা এদিন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে বাঙালি একটি পতাকা আর স্বাধীন একটি ভূখণ্ড অর্জনের লড়াই শুরু করেছিল।২৬
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলার মানুষের ভোটে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহার কারণে বাংলার মুক্তকামী মানুষ ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে ২৫ শে মার্চ কালরাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ সারাদেশে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে পাক সেনাবাহিনী নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য নিরস্ত্র মানুষের ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করে সেনারা। যখন সাধারণ শান্তিপ্রিয় বাঙালি মধ্যরাতে ঘুমে আচ্ছন্ন তখন তাদের ওপর জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক উঠিয়ে দেয়া হলো। স্টেন গান, কাটা রাইফেল আর গোলার আঘাতে পুরো শহর বদ্ধভূমিতে পরিণত করলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে পিচঢালা পথে ছুঁড়ে মেরে ছিলো তারা। নবদম্পতির সুখের বাসর বেদনার গভীর রাতে পর্যবসিত করলো। বাবা হারালো তার প্রিয়তমকে ছেলেকে। মা হারালো তার প্রিয়তমকে। কত স্বজন কতোটা নির্মমভাবে অসহায় হয়েছিল সেদিন। পাকিস্তানের উর্দিপরা জেনারেলরা এদেশের নিরীহ বাঙালিকে প্রাণে মেরে ফেলে তুমুল উৎপীড়নে ফেটে পড়েছিল। ভয়ার্ত মানুষেরা সহায়-সম্বল আত্মীয়-আপনজনকে হারিয়ে প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক ছুটে ছিলো। কিন্তু পিস্তলের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আবার তারা রাস্তায় নুয়ে পড়েছিল। সে সময় কেউই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বুলেট থেকে রক্ষা পায়নি। ভয়ার্ত সে কালরাত্রির পোড়া শহর, লাশ আর শিশুর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল এর পরের দিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। কিন্তু তার ওপর জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ে তুলল তুমুল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে ট্যাঙ্কের সামনে পেতে দিল সাহসী বুকের উঠান। আজ থেকে ৪৫ বছর আগের ঠিক এমনি এক ভোররাতে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালিরা জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই নৃশংস নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে শুরু করে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। আমাদের পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনী, আনসার, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক—সবাই মিলে প্রাণপণ এক যুদ্ধে মিলিত হলো, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা আর মুক্তি।

দীর্ঘ সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি ৩০ লাখ শহীদকে, দুই লাখ মা-বোনের ওপর চলেছিল সীমাহীন বর্বরতা। সেই সব শহীদ-পরিবারের সদস্যরা আজও বয়ে চলেছেন স্বজন হারানোর দুঃসহ বেদনা। তবে বেদনার বিপরীতে গৌরব আর আনন্দও আছে। ২৬ মার্চ থেকে যে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, নয় মাস পর ১৬ ডিসেম্বর সেই যুদ্ধের সফল পরিণতিতে আমরা অর্জন করেছিলাম গৌরবের বিজয়। আজ আমাদের সেই বিজয়ই স্মরণ করার দিন।

ঘোরতর ওই অমানিশা ভেদ করে সেদিন দেশের আকাশে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য। কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়- জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত/বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে/প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে/মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে/সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন/ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময় ১৯৭১, শ্রেষ্ঠ ঘটনা স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা।

ইতিহাস থেকে ওপরোক্ত কথা গুলোর ওপর  জ্ঞন অর্জন করে এতটুকুই বলতে পারি স্বাধীনতা এসেছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সুদীর্ঘকালের সংগ্রাম, আপসহীন আন্দোলন এবং একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে। বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার শপথ গ্রহণ করি। আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে। গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সব নারী ও পুরুষকে, যারা নিজ নিজ অবস্থান ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সম্ভব করে তুলেছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মকে।

ইতিহাস স্বীকার করে সম্পাদকীয়; বুলবুল আহমেদ সোহেল ।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: মুক্ত কলাম, সম্পাদকীয়

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*