• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০২:৩১ অপরাহ্ন

ভুয়া সাংবাদিকের দৌরাত্ম্য : সংকটে প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩০, ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন / ১৫৫
ভুয়া সাংবাদিকের দৌরাত্ম্য : সংকটে প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ এক সময় সাংবাদিকতা ছিল সমাজ বদলের এক অমলিন হাতিয়ার। সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে, ভয়ডরহীন ভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরাই ছিল সাংবাদিকতার পরিচয়। সংবাদমাধ্যম ছিল জনমানুষের আশ্রয়, আর সাংবাদিক ছিলেন নির্ভরতার নাম। কিন্তু সময় বদলেছে, আর সেই বদলের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতার প্রকৃত মূল্যবোধ, নৈতিকতা আর মর্যাদা। আজকের বাস্তবতা যেন এক বেদনাদায়ক নাট্যমঞ্চ—যেখানে কলমের জায়গা দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জায়গা দখল করেছে ইউটিউব লাইভ, টিকটক নিউজ আর ফলোয়ার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা।

সাংবাদিকতার মূল সংজ্ঞাই যেন এখন ধোঁয়াশা। যার হাতে ক্যামেরা বা মোবাইল আছে সে-ই সাংবাদিক, যার গলায় কার্ড আছে সে মিডিয়া। আর এ সুযোগেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভুয়া সাংবাদিকদের বিশাল বাহিনী। চায়ের দোকান, পার্লার আর মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার হয়েছে মিডিয়া অফিস।

সারাদেশে রীতিমতো মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে ভুয়া প্রেস কার্ডধারীর উত্থান। শহর থেকে গ্রাম—চায়ের দোকান, বিউটি পার্লার, মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারের পাশেই ঝুলে থাকে ‘মিডিয়া অফিস’-এর ব্যানার। সেখানে নাম লেখা থাকে জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, ক্রাইম রিপোর্টার, চিফ করেসপন্ডেন্ট—তা সে যে-ই হোক, তার কাজের কোনও পরিচয় নেই, নেই কোনও বৈধ অনুমোদন। কার্ড পেলেই সে সাংবাদিক। পুলিশ থেমে যায়, বাজারে ‘স্যার’ সম্বোধন মেলে, প্রশাসনিক দপ্তরে দরজা খুলে যায়। অথচ প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে না—কোন পত্রিকায় কাজ করেন? বেতন পান? রিপোর্ট কোথায় ছাপা হয়?

‘প্রেস কার্ড বাণিজ্য’—নতুন আতঙ্কঃ এক শ্রেণির তথাকথিত ‘মিডিয়া মালিক’ এখন সাংবাদিকতা বানিয়ে ফেলেছে লাভজনক ব্যবসা। তারা প্রেস কার্ড বিক্রি করেন প্যাকেজ আকারে—“টাকা দিন, পদ নিন! কেউ জেলা প্রতিনিধি, কেউ চিফ রিপোর্টার, কেউবা বিশেষ প্রতিনিধি—এমনকি ‘চিফ এডিটর’-ও! বানান ভুল হলেও সমস্যা নেই—কার্ড দেখেই তো সবাই বিশ্বাস করে! এই বাণিজ্য ফুলে-ফেঁপে ওঠায় প্রকৃত সাংবাদিকরা আজ বিব্রত, হতাশ এবং অনেক ক্ষেত্রে অসহায়।

চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিং—সাংবাদিক নামধারীদের নতুন কারবারঃ স্মার্টফোন হাতে কিছু লোক নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে শুরু করেছে ভিন্ন এক রাজত্ব। দোকানে গিয়ে ভিডিও করে ভয় দেখানো। থানায় লাইভ দিয়ে কর্মকর্তাদের হেনস্তা। সড়কে রিকশা, দোকান, ব্যবসায়ীর ওপর চড়াও হওয়া। প্রভাবশালী পরিচয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি। এসব কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ আজ সাংবাদিক দেখলেই ভীত হয়, সন্দেহ করে, মনে করে—এরা হয়তো চাঁদাবাজ বা সুবিধাভোগী কোনো দালাল।

সম্প্রতি এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই তাদের নামধারী মিডিয়া একটি বানোয়াট প্রতিবেদন প্রচার করে তাকে নানাভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালায়। এমন ঘটনা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রশাসনের উদাসীনতা আর পাঠকের নীরবতাঃ ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য শুধু সাধারণ মানুষের জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না—এটি প্রকৃত সাংবাদিকদের অস্তিত্বও সংকটের মুখে ফেলছে। রাজনৈতিক প্রভাব, কিছু অসৎ প্রশাসনিক ব্যক্তির ছায়া, আর পাঠকের নীরবতা এই সমস্যাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। অনেক সময় অপরাধী, চাঁদাবাজ, এমনকি মামলাভুক্ত আসামিরাও সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়—থানা, দপ্তর, অফিস সবখানে প্রবেশ করতে পারে। এতে সমাজে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে—সাংবাদিকতা যেন ‘ঢাল-তলোয়ার’ পাওয়ার সহজ উপায়।

প্রকৃত সাংবাদিকের অবস্থা—অপরিচয়ের দুঃখঃ যে পেশায় থাকতে হলে নৈতিকতা, ত্যাগ আর সাহসের প্রয়োজন, সেই পেশাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। প্রকৃত সাংবাদিক—যারা রাতদিন পরিশ্রম করে সত্য খুঁজে বের করেন, যাদের কাজ হলো সমাজের অন্যায় তুলে ধরা—তারা আজ নানা সন্দেহের মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যে মানুষের চোখে এখন ‘সাংবাদিক’ আর ‘চাঁদাবাজ’—একই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সাংবাদিকতা—পেশা নয়, মানুষের সেবার পথঃ সাংবাদিকতা কখনোই শুধুই পেশা ছিল না। এটি মানুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা। যে পেশায় সততা, বিবেক আর নির্ভীকতা ছাড়া টিকে থাকা যায় না—সে পেশায় অনুপ্রবেশ করেছে অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত আর অপরাধীদের একটি বড় অংশ। তারা ভুয়া আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কার্ড নিয়ে এলাকায় দাপট দেখায়, সরকারি-বেসরকারি অফিসে অনধিকার প্রবেশ করে, মানুষকে হয়রানি করে। এতে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষয় হচ্ছে দ্রুতগতিতে।

পাঠককে জানতে হবে—সাংবাদিকতা কার্ডে নয়, চরিত্রেঃ এখন প্রয়োজন সত্যিকারের সাংবাদিকতার সংজ্ঞা পুনর্গঠন। সাংবাদিকতা শুধু লাইভ ভিডিও নয়, শুধু ক্যামেরা চালানো নয়—এটি দায়িত্ব, নৈতিকতা, ত্যাগ আর সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। যে কেউ কার্ড বানালেই সাংবাদিক—এ ধারণা ভাঙতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল, প্রশাসন—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ভুয়া সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে পাঠককেও সচেতন হতে হবে—কে প্রকৃত সাংবাদিক? আর কে শুধু পরিচয়ের আড়ালে সুবিধাভোগী?

অপসাংবাদিকতা—সাংবাদিকতা পেশার ওপর এক অশনি সঙ্কেতঃ যে পেশা জাতির দিশা দেখায়, সেই পেশায় অপসাংবাদিকদের অনুপ্রবেশ এক ধরনের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ। যেমন—অপপত্রিকার কার্ড বিক্রি, ভুয়া নিউজ পোর্টালের নাম ব্যবহার, ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক দালালি। এই মহামারি রোধে এখনই শক্ত ভূমিকা প্রয়োজন। নয়তো সাংবাদিকতার অন্দরমহল ভেঙে পড়বে, ভেঙে পড়বে জনগণের আস্থা।

সমাপনী কথা—যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, তাদের পাশে দাঁড়ানোর সময় এখনইঃ সত্যিকারের সাংবাদিকরা আজও নীরবে, নিরলসভাবে কাজ করছেন—বৃষ্টিতে-রোদে, ঝুঁকি নিয়ে, প্রভাবশালীর হুমকি উপেক্ষা করে। তারা কখনো লাইভ দিয়ে চমক দেখান না; তারা সংখ্যার পেছনে ছুটেন না। তারা কাজ করেন সত্যের পক্ষে। সমাজ তাদের প্রয়োজন, রাষ্ট্র তাদের প্রয়োজন, মানুষ তাদের প্রয়োজন। আজ সময় এসেছে বলার। সাংবাদিকতা কার্ডে নয়, চরিত্রে। মিডিয়া অফিসে নয়, মানুষের আস্থায়।

আসুন, আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই—
যারা আজও অন্ধকারে আলো জ্বালানোর সাহস রাখেন। যাদের কলম এখনও সত্যের জন্য অবিচল।