শিরোনাম

বিজয়ের ধ্বনি

mohan_bijoy_dibosh3বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সর্বত্র উড্ডীন লাল-সবুজের রক্তাক্ত জাতীয় পতাকা। পর্যুদস্ত পাক হানাদাররা। ইসলামাবাদে ইয়াহিয়া খান বেসামাল। ঢাকায় জেনারেল নিয়াজী ও রাও ফরমান আলীরা দিশেহারা। যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অনিবার্য। এখন তাদের আত্মরক্ষার পালা। পাকিস্তানের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মুক্তাঞ্চলে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আকাশে উড়ল স্বাধীন বাংলার পতাকা। আনুষ্ঠানিক বিজয়ের আগেই একাত্তরের এদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাক হানাদারদের মনোবল ভেঙ্গে চুরমার। দেশের বিভিন্নস্থান থেকে শুধুই বিজয়ের খবর। অধিকাংশ জেলাই হানাদারমুক্ত। কিন্তু তখনও পাকিস্তানের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকাতে মরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরাক্রমশালী এ দেশটি নানা হুমকি-ধমকি দিয়েও চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে মুক্তিকামী বাংলার দামাল ছেলেদের অগ্রযাত্রা এতটুকুও থামাতে পারেনি।

একাত্তরের রক্তক্ষরা এ দিনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতিনিধি ভোরেন্তসভকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘পরদিন (১২ ডিসেম্বর) মধ্যাহ্নের আগে ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুঁশিয়ারি সামান্যতম মনোবল ভাঙ্গতে পারেনি মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর অকুতোভয় বীর সেনানীদের। চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের ওপর আক্রমণ আরও শাণিত হয়। যুদ্ধ চলছে চারদিকে। আর এক এক করে মুক্ত হচ্ছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। একাত্তরের ডিসেম্বরের এদিন ঢাকার আশপাশের মানুষ এদিন পেয়েছিল মুক্তির স্বাদ। মুক্তিবাহিনীর মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিজয়।

ঢাকা বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে চারদিক থেকে ট্যাঙ্কসহ আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে বাংলার বীর মুক্তি সেনারা এগিয়ে আসছিল। পথে পথে যেসব জনপদ, গ্রাম, শহর-বন্দর পড়ছিল সর্বত্রই মুক্তিসেনারা নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে ওড়াতে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। একাত্তর সালের এদিন জামালপুর, মুন্সীগঞ্জ, আশুগঞ্জ, টাঙ্গাইল, দিনাজপুরের হিলিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা শত্রুমুক্ত হয়।

এ সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। যদিও এসব এলাকা মুক্ত করতে গিয়ে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে ব্যাপক যুদ্ধ করতে হয়। শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার মাটি। মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী নিয়ন্ত্রিত টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চলে একাত্তরের এই দিনে মিত্রবাহিনীর ৭০০ সৈন্য অবতরণ করে। এ সময় পাকিস্তানী ব্রিগেডের সঙ্গে তাদের তীব্র যুদ্ধ হয়।

অন্যদিকে একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানের আরেক শক্ত ঘাঁটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামো, জাহাজ, নৌযান ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ ব্যাপক তৎপরতা চালায়। একের পর এক বোমা ও রকেট হামলা চালিয়ে বিধ্বস্ত করে দেয় পাক হানাদারদের সবকিছু। আকাশ ও স্থলে মুক্তি ও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা পাক সৈন্যরা নদী পথে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সর্বত্র সতর্ক প্রহরা যে আগেই বসানো হয়েছিল তা জানা ছিল না হানাদারদের। তাই পাকি সামরিক পোশাক ছেড়ে সাধারণবেশে নদীপথে অনেক পাক সৈন্য পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে।

একাত্তরের এদিন যশোরের মুক্ত এলাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈঠক করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো (১) বাংলাদেশ সরকার ওয়ার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এ ট্রাইব্যুনাল নরহত্যা, লুণ্ঠন, গৃহদাহ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে যুদ্ধ বন্দীদের বিচার করবে। (২) ২৫ মার্চের আগে যিনি জমি দোকানের মালিক ছিলেন তাদের সব ফিরিয়ে দেয়া হবে। (৩) সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। (৪) জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামী ইসলামী নিষিদ্ধ করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ইয়াহিয়া খান বাঙালী জাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা তা পারল না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এ শিশু রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার দায়িত্ব এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে পরস্পরের সার্বভৌম ও স্বাধীনতা অক্ষুণ রেখে।

এদিকে মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলী খানের মাধ্যমে ডাঃ মালিকের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ঢাকায় নিয়োজিত জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে পেশ করা হয়। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল (১) পূর্বাঞ্চলে নিয়োজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। (২) বাংলাদেশের গেরিলাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে সরকারীভাবে যোগাযোগ করা হবে না। (৩) এ লক্ষে বেসামরিক পশ্চিম পাকিস্তানী নাগরিককে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। (৪) পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পর্যায়ক্রমে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং (৫) জাতীয় পরিষদের আওয়ামী লীগ দলভুক্ত সদস্যদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আত্মসমর্পণের এমন শর্তের খবরে চারদিকে মুক্তিবাহিনীর উল্লাস ও জয় আর জয়। চারদিকে পত পত করে উড়ছে লাখো শহীদের রক্তস্নাত মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের স্বাধীন-সার্বভৌম জাতীয় পতাকা।

 

Be Sociable, Share!
বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*