শিরোনাম

প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় নতুন সংযোজন বজ্রপাত ; বায়ু দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও বৃদ্ধি পাচ্ছে বজ্রপাত

বুলবুল আহমেদ মোহেল / মোহাম্মদ রেণি শেখ : দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় নতুন সংযোজন বজ্রপাত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সম্প্রতি কয়েক বছরে যে হারে বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে বাংলাদেশ বজ্রপাত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে ঝড় ও বজ্রঝড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটছে বাংলাদেশে। তাদের মতে, সাম্প্রতিকালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো বায়ু দূষণ। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও এটি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে গত ১০ বছরের বাংলাদেশে মারা গেছে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ। বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। এ সময়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারের ৪০টির বেশি বজ্রপাত হচ্ছে। তাদের মতে, বর্তমানে বজ্রপাত বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে। ফলে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটেছে। বজ্রপাত দেশে বর্তমানে একটি দুর্যোগে রূপ নিয়েছে।এ বছর মৌসুমের শুরুতেই বজ্রপাত ভয়ঙ্কর রূপধারণ করেছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হলেও সামান্য মেঘেই শুরু হচ্ছে ভয়ঙ্কর বজ্রপাত। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ও শুক্রবার সকালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮ জনে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অনেক।news বজ্রপাত

আবহাওয়া অধিদফতরের ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী দেশে দুটি সময় মূলত বজ্রপাত বেশি হয়। এর মধ্যে একটি হলো প্রাইমারি সামার, যা এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত। এ সময় মূলত ভ্যাটিক্যাল ক্লাউড বা স্তম্ভ মেঘ থাকে। বজ্রপাত আর কালবৈশাখী বেশি হয়। আর এ মেঘ থেকে খাড়াভাবে বজ্রপাত হয়। যে কারণে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে। বাংলাদেশ এ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এফআর সরকার বলেন, এপ্রিল-মে মাসে ঘন কালো মেঘে খাড়াভাবে যে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয় তাতে তাপের পরিমাণ থাকে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রী ফারেনহাইট। বজ্রপাতের গতিও প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার বেগে নিচে বা উপরের দিকে চলে যায়। ফলে এ পরিমাণ তাপসহ বজ্র আওয়াজ মানুষের দেহের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক। এ সময় আকাশে যে মেঘ তৈরি হয় তার ২৫ থেকে ৭৫ হাজার ফুটের মধ্যে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে বেশি। এ এলাকার মধ্যে দুটি ত্বড়িত প্রবাহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফিকশন ঘটে। তার মতে, শীতপ্রধান এলাকায় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে না। আবার যে মেঘে দুটি ত্বড়িত প্রবাহের মধ্যে আনুভূমিক সংঘর্ষ হয়, তা থেকে সৃষ্ট বজ্রপাতে তেমন কোন ক্ষতি হয় না। মূলত বর্ষার সময় এ ধরনের বজ্রপাত হলে মৃত্যের সংখ্যা বেশি হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বে বজ্রপাতে মুত্যুর এক-চতুর্থাংশ ঘটে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় মূলত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতের আক্রান্তের শিকার ৭৬ ভাগ পুরুষ। এ সংস্থার মতে, বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে আশ্রয় গ্রহণকারীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রিস্ক ফ্যাক্টরস এ্যান্ড সোশ্যাল ভারনারেবেলিটি শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রতিবছর দেড়শ’র মতো লোকের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও এ সংখ্যা ৫শ’ থেকে এক হাজার। এ সংস্থার মতে, ঝড় ও বজ্রঝড়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে বাংলাদেশে। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর দেয়া তথ্যমতে, বজ্রপাতে দেশে প্রতিবছর ৩০০ থেকে ৩৫০ মানুষের মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের ভয়াবহতা ও প্রতিকারের উপায় নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গবেষণার জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সার্ক মিটিওরোলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার। এ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বজ্রপাতের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ সংস্থার মতে, বাংলাদেশ বজ্রপাত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।বজ্রপাত ১

তবে ঠিক কী কারণে আকাশে ভয়াবহ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে, ক্রমান্বয়ে কেনই বা বিধ্বংসী রূপ গ্রহণ করে এর সঠিক কারণ এখনও বিজ্ঞানীদের জানা নেই। তবে তারা ধারণা করছেন, বিশ্বে উষ্ণায়নের প্রভাবে বজ্রপাতের ভয়াবহতা বাড়ছে। তাদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ামন্ডলে তাপমাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ লক্ষগুণ বেশি। ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের শোষণ ক্ষমতা একেবারে কমে এসেছে। ক্রমেই পৃথিবীর উষ্ণায়ন বাড়ছে। এ কারণে বজ্রপাত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

তবে এর পাশপাশি বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো বায়ু দূষণ। তাদের মতে, বজ্রপাতের কারণে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তেমনি পরিবেশ দূষণের কারণে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে বায়ু দূষণের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১১টি স্থানে স্থাপিত বায়ু দূষণের মান পরীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সর্বক্ষণিকভাবে বায়ুর মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, রাজধানীর ঢাকার বায়ু দূষণ শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে নবেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এ সময়ে বায়ু দূষণের অন্যতম উপাদান যেমন পার্টিক্যাল ম্যাটার বা বস্তুকণা-১০ ও বস্তকণা-২.২৫ বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আর এই দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাজধানী ও এর আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাঁটিগুলোকে। এ সময়ে বায়ু দূষণের মূল কারণ হলো ইটের ভাঁটি চালু হওয়া, বৃষ্টিপাত কম হওয়া। এছাড়া বাতাসের গতিবেগ কম থাকার কারণে রাস্তাঘাটে বস্তুকণার উপস্থিতি প্রচুর পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকাল বৃষ্টিবিহীন থাকায় ওই সময়ে বজ্রপাত নেই বললেই চলে। মার্চ-এপ্রিল মাসে সৃষ্ট কালবৈশাখীতে বায়ু দূষণের কারণেই বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের পরপরই বায়ুমন্ডলের সবচেয়ে নিচের স্তরে সাইট্রোজেন অক্সসাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা কার্বন-মনো-অক্সাইডের চেয়ে বেশি বিষাক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড রূপান্তরিত হয়ে রীতিমতো তা পরিণত হয় ওজোন গ্যাসে। এ গ্যাস বাতাসে এমনভাবে ভেসে বেড়ায় যার ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে বায়ু দূষণের মাত্রা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের পেছনে অন্যতম কারণ বায়ু দূষণ। বজ্রপাতকে আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কেউ কেউ। ২০০৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত কনফারেন্স অব লাইটিং প্রটেকশন শীর্ষক সম্মেনে বলা হয় বায়ু দূষণ তথা পরিবেশ দূষণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বজ্রপাতের।

দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণের ফলে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেঘ সৃষ্টির সময় বায়ুমন্ডলে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক (নেগেটিভ ও পজিটিভ) ত্বড়িত প্রবাহ সৃষ্টি হয়। আর এ দুটি ত্বড়িত প্রবাহের স্পর্শে প্রচন্ড বিস্ফোরণ হয়। আর এ বিস্ফোরণের ফলে আলো ও শব্দের উৎপত্তি হয়। কিন্তু আলোর গতিবেগ শব্দের চেয়ে বেশি হওয়ায় বজ্রপাতের আগে বিদ্যুত চমকাতে দেখা যায়।rain 4

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়ামন্ডলের উপরিভাগে সব সময় ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করে। সেখানে বায়ুর চাপ কম থাকে, হালকা মেঘমালাও সব সময় বিরাজ করেন। অপরদিকে পৃথিবীর নিম্নভাগে বায়ু ম-লের চাপ বেশি থাকার পাশাপাশি অধিক তাপমাত্রা বিরাজ করে। বিশেষ করে দিনের বেলায় সূর্যের তাপে সাগর, নদী, পুকুর, খাল-বিলের পানি বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই বাষ্পীভূত পানি আকাশে মেঘসৃষ্টি করে বৃষ্টিপাতের সৃষ্টি করে। যখন এই গরম বাষ্প উপরে উঠে যায়, ওপরের ঠান্ডা বায়ু ও মেঘের সঙ্গে মিশে এক ধরনের ত্বড়িত প্রবাহের সৃষ্টি হয়। নিজের দিক থেকে ওপরে উঠে যাওয়া গরম আবহাওয়া থেকে ধনাত্মক (পজিটিভ) ত্বড়িত প্রবাহ সৃষ্টি হয়। আর ওপরে ঠান্ডা বাতাস থেকে সৃষ্টি হয় ঋণাত্মক ত্বড়িত প্রবাহ। এ দুটি তড়িত প্রবাহ যখন একসঙ্গে মিশে যায় সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় তখনই বজ্রপাত ঘটে। ##

Be Sociable, Share!
বিভাগ: প্রধান খবর - ২, বিশেষ প্রতিবেদন, সারা বাংলার খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*