শিরোনাম

প্রথম মুসলিম সবাক নায়িকা রানী যোবায়দা

264408_110আজকেরবিডি বিনোদন ডেস্ক: ১৯৩১ সালের মার্চ মাস। উপমহাদেশের দর্শকেরা অবাক বিস্ময়ে দেখল নায়িকাদের মুখে কথার কলি ফুটছে। কবি নজরুলের ভাষায় এ যেন ‘আধো আধো বোল বাজে ….’। পর্দালোকের স্বপ্নের রানীরা এত দিন ধরে শুধু শারীরিক রূপ-লাবণ্য ও যৌবনের বিস্তার দিয়ে বিলোল কটাক্ষ হেনে মোহময় চপল নৃত্র দিয়ে কামরাঙা ঠোঁটে বোবা হয়ে কেবলি আকুলি-ব্যাকুলি করত, সেই রানীদের কিন্নর কণ্ঠ সরব হলো প্রথম। কোটি কোটি দর্শক অবাক হয়ে সবাক নায়িকাদের দেখে এবং শুনে আবেগে নির্বাক হয়ে গেল।

সেই অবাক করা প্রথম সবাক ছবি ‘আলম আরা’র নায়িকা যোবায়দা ১৯৮৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চিরদিনের মতো নির্বাক হয়ে পরপারে চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। এই উপমহাদেশের প্রথম বায়োস্কোপ দেখানো হয় ১৮৯৬ সালে বোম্বের ওয়াটসন হোটেলে আর ঢাকার মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ১৯০০ সালের দিকে। ১৯১৩ সালে ডিজি ফালকে তৈরি করেন উপমহাদেশের প্রথম কাহিনী চিত্র ‘রাজা হরিশ চন্দ্র’। ১৯৩১ সালে আরদেশীর ইরানী তৈরি করেন প্রথম সবাকচিত্র ‘আলাম আরা’। এটি ছিল মূলত একটি জনপ্রিয় নাকট। ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ছবির নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন যোবায়দা। ছবিতে অন্যান্যের মধ্যে অভিনয় করেন পৃথিরাজ, মাস্টার ভিতল জগদীশ শেঠী, জিল্লোবাই, ডবলিউ এম খান প্রমুখ।

ইতিহাস সৃষ্টিকারী আলম আরার নায়িকা যোবায়দার জন্ম ১৯১২ সালে সুরাটের এক অসমি পিতা-মাতার ঘরে। তার পিতার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ ইয়াকুব খান আর মায়ের নামে ফাতেমা বেগম। মামলা-মোকদ্দমার ঝামেলা শেষে যোবায়দা শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছেই থাকার অনুমতি পান।

মা ফাতেমা ১২ বছরের যোবায়দাকে নিয়ে বোম্বে পাড়ি দেন। ফাতেমা বেগম ছিলেন সেকালের বিখ্যাত মঞ্চাভিনেত্রী। তার ছিল রূপ-লাবণ্যের খ্যাতিও। মায়ের রূপ-লাবণ্য পেয়েছিলেন মেয়ে যোবায়দাও। ফাতেমা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ে যোবায়দাকে অভিনেত্রী বানাবেন। মায়ের উদ্যোগে যোবায়দা ১২ বছর বয়সেই প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনীত প্রথম নির্বাক ছবির নাম ‘গুলে বাকাওলী’। এর পর থেকে স্টুডিও হয়ে ওঠে যোবায়দার বিচরণ ক্ষেত্র, ক্যামেরা হয়ে ওঠে বন্ধু। তার শারীরিক সৌন্দর্য আর অভিনয় দক্ষতার কারণে বাড়তে থাকে ছবির সংখ্যাও। তিনি অভিনয় করেন নির্বাক ৩৬টি ছবিতে। ‘পাপের পরিণাম’ ছিল তার অভিনীত শেষ নির্বাক ছবি।
১৯৩০ সালের শেষ দিকে এ এম ইরানী সবাক ‘আলম আরা’ ছবি নির্মাণের চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেন। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি নায়িকা হিসেবে যোবায়দাকে নির্বাচিত করেন। উপমহাদেশের প্রথম সবাক ছবি ‘আলম আরা’র পর যোবায়দা আরো ২০টি সবাক ছবিতে অভিনয় করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মীরাবাঈ, বিসর্জন, মা। মীরাবাঈ ছবিতে তিনি ২৩টি গান গেয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, যোবায়দা ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর গায়িকাও। যোবায়দা পরে প্রযোজিকা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। তার চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘মহালক্ষ্মী সিনেটোন’। এই প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি রাজা ধনরাজগিরির সংস্পর্শে আসেন। পরে দু’জন প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন। ধনরাজগিরির সাথে তার পরিচয় ছিল বারো বছর বয়স থেকেই। যোবায়দা অভিনীত সর্বশেষ সবাক ছবি ছিল ‘মা’ (১৯৩৬)। এ সময় তার পারিশ্রমিকের হার ছিল সাড়ে তিন হাজার টাকা।

খ্যাতির শিখরে থাকতে থাকতে তিনি চিত্রজগত থেকে বিদায় নেন। স্বামী রাজ ধনরাজগিরির ইচ্ছে অনুসারেই তিনি চিত্রজগত ছাড়েন রূপ-লাবণ্য ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও। নির্বাক ও সবাক যুগে দর্শক চিত্তজয়ী রানী যোবায়দার সাম্প্রতিক বছরগুলো কেটেছে নির্জন পারিবারিক পরিবেশে নানা অসুস্থতায়। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা যোবায়দা বহুমূত্র, শ্বাসকষ্ট ও বাতে ভুগছিলেন জীবনের শেষপ্রান্তে এসে। বাতের কারণে তার একটি পা অবশ হয়ে যায়। পরে তাতে ধরে পচন। শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত পা কেটে বাদ দিতে হয়।

যোবায়দার জীবনের শেষ দিনগুলো কাটত বই পড়ে, শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে আর অতীতের স্মৃতিচারণ করে। যোবায়দার মনে পড়ত সেই সব সোনালি দিনের কথা। মনে পড়ত পরিচালক এ এম ইরানী, মনিলাল যোশী, নানু ভাই উকিল, চান্দুলাল শাহ, অভিনেত্রী সুলোচনা, অভিনেতা জ্যাল মারচেস্ট, পরিচালক রাজ কাপুর, মেহবুব প্রমুখের কথা।

একবার ‘সোসাইটি’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ১৯৮৫ সালে তিনি বলেছিলেন ‘আমি যদি আজকে চিত্রজগতে থাকতাম তাহলে রাজকাপুর পরিচালিত ছবির নায়িকা হতেই পছন্দ করতাম।’ আমার মতে, রাজকাপুর হচ্ছেন একজন চমৎকার পরিচালক। উল্লেখ্য, রাজকাপুর জুনের (১৯৮৫) প্রথম সপ্তাহে মারা গেছেন।

উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের নির্বাক ও সবাক যুগে মুসলিম অভিনেত্রী হিসেবে যোবায়দার উপস্থিতি ছিল যেমন সাহসিকতাপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণও। যোবায়দার মৃত্যুর সাথে সাথে একটি ঐতিহাসিক জীবনের সমাপ্তি ঘটল।

যোবায়দার মৃত্যুর সংবাদে ঢাকা তথা বাংলাদেশের অনেক প্রবীণ দর্শকও আবেগে আপ্লুত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যোবায়দা অভিনীত উপমহাদেশের প্রথম সবাক চিত্র ‘আলম আরা’ ঢাকার লায়ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল। এর পরিবেশক ছিলেন এফ এ দোসানী (কলকাতাবাসী পরে ঢাকাবাসী সবশেষ করাচিবাসী)।
যে ‘আলম আরা’ ছবির জন্য যোবায়দা ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছেন, সে ছবিতে তার ভূমিকা ছিল সেনাপতির আদুরে কন্যার। সুন্দরী তরুণী সে কন্যা ভালো বেসেছিল এক রাজপুত্রকে। রাজার ছিল দুই রানী। একজন খারাপ আরেকজন ভালো। যোবায়দা ভালোবেসেছিল ওই ভালো মায়ের পুত্রকে। অতঃপর তারা সুখে কাল কাটিয়েছিল আর সেই সাথে যোবায়দা পেয়েছিলেন প্রথম মুসলিম ‘সবাক নায়িকা’র সম্মানও।
পরিশিষ্ট :

যোবায়দা নির্বাক ৩৬টি এবং সবাক ২০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘বীর অভিমন্য’ (১৯২২), ‘গুলে বাকাওয়ালী’ (১৯২৪), ‘কল্যাণ খাজিনা’ (১৯২৪), ‘কালনাগ’ (১৯২৪), ‘পৃথ্বি বল্লভ’ (১৯২৪), ‘কালাচোর’ (১৯২৫), ‘দেবদাসী’ (১৯২৫), ‘দেশ কা দুশমন’ (১৯২৫), ‘ইন্দসভা’ (১৯২৫), ‘অবলা নারী’ (১৯২৬), ‘বুলবুল পরীস্থান’ (১৯২৬), ‘লায়লা মজনু’ (১৯২৭), ‘ননদ ভাওজাই’ (১৯২৭), ‘বিসর্জন’ (১৯২৮), ‘কনকতারা’ (১৯২৯), ‘বীর রাজপুত্র’ (১৯৩০), ‘রূপসুন্দরী’ (১৯৩১), ‘আলম তারা’ (১৯৩১), ‘হরিজন’ (১৯৩৩), ‘মীরাবাঈ’, ‘মা’ (১৯৩৬), ‘সুভদ্রা হরণ’, ‘দেবদাস’ (১৯৩৭), ‘জরিনা’, ‘গুলে সোনবার’, ‘রসিক-এ-লায়লা’, ‘নির্দোষ অবলা’ (১৯৪৯)। তিনি ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যান। যোবায়দা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটক অবলম্বনে নির্মিত ‘বিসর্জন’ (১৯২০) চিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: বিনোদন

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*