শিরোনাম

সিরিয়া থেকে ইরানের বিদায়!

2015_12_15_12_37_19_UQieyZY95lhoUZqeAJfcPWfsCuyyYG_originalচতুর্থ সপ্তাহের মতো সিরিয়াতে বিমান হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। সিরিয়ায় রাশিয়ার অভিযান পূর্ববর্তী সময়ের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘটনার মধ্য দিয়ে সিরিয়ার যুদ্ধবর্তী অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। যুদ্ধ মঞ্চে রাশিয়ার প্রবেশের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পশ্চিমা বিশ্বের কৌশলে পরিবর্তন এসেছে তেমনি স্থানীয় অনেক আঞ্চলিক ক্রীড়ানকের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ও আভ্যন্তরীন নেতারা এখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান চাইছেন। এরকমই একটি আলোচনা চেষ্টা অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত সপ্তাহেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, তুরস্কের দামেস্কে এবং মালিকিয়ায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র দলগুলোর মোট একশ প্রতিনিধি ওই আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে।

এই আলোচনা নিয়েও রাজনীতির শেষ নেই যেন। আলোচনার সময় এক পক্ষ থেকে আওয়াজ তোলা হয় যে, সিরিয়া অভিযান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অপর এক শক্তিশালী দেশ ইরান সরে দাড়াচ্ছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিত হিসেবে বলা হয়েছিল যে, সিরিয়ায় রাশিয়ার আধিপত্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তার সেনাবাহিনী প্রয়োগ কমিয়ে এনেছে। শুধু তাই নয়, এটাও বলা হচ্ছে যে রাশিয়া জোরপূর্বক ইরানকে পিছু হঠিয়ে দিচ্ছে। যদিও সিরিয়ার ভবিষ্যত প্রশ্নে ইরান আজ অবধি কোনো স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি, যা থেকে সিরিয়া সম্পর্কে ইরানের নির্দিষ্ট অবস্থান বোঝা যাবে।

ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন অভিযোগও করা হচ্ছে। যদিও দুই পক্ষের কোনো অভিযোগই পুরোপুরি আমলে নেয়া যাচ্ছে না, কারণ দুইপক্ষের কাছেই তাদের মতামত সাপেক্ষে নেই কোনো শক্তিশালী তথ্য প্রমাণ। তবু এটাতো সত্যি যে, ইরান সিরিয়াকে সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে শুরু থেকেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি ইরানকে সিরিয়া ত্যাগ করতে হয়, সেটা সিরিয়ার ক্ষমতাসীনদের কাছে পলয়ানপরতা মনে হতেই পারে। প্রকৃতপক্ষে, সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইরান কী বলে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে অবশ্য ইরানের পশ্চাদপসরণ বিষয়টিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমাদের মতে, শুধু ইরান নয় রাশিয়াও যদি সিরিয়া থেকে তাদের অভিযান বন্ধ করে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় তবেই সিরিয়ার দ্বন্দ্ব নিরসন সহজ হবে। যদিও এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়া পরিস্থিতিতে ইরান এবং রাশিয়া অংশগ্রহন করার আগেও অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছিল এবং পশ্চিমা জোট পরিস্থিতি জটিল করার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারেনি। কিন্তু সিরিয়ার অবস্থা বিবেচনায় এমন পরিস্থিতিতে ইরান এবং রাশিয়াকে এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে হয়েছে যখন তারা আক্রান্ত হয়েছে।

ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ড সদস্যরা অনেকদিন ধরেই সিরিয়ার সংঘাত পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সক্রিয় আছে। যদিও হেজবুল্লাহ, ন্যাশনাল ডিফেন্সের মতো কিছু সংগঠনের সহায়তাকারী হিসেবেও তাদের নাম প্রায়শই শোনা যায়। ভূ-রাজনীতির স্বার্থে ইরান অনেকদিন ধরেই গোপনে এবং প্রকাশ্যে এই সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে যুদ্ধাস্ত্র দেয়ার মতো সহায়তাও করছে। তাই এটা ভাবা খুব ভুল হবে যে, সিরিয়ার মাটি থেকে ইরানের সেনাবাহিনী চলে যাচ্ছে মানেই সিরিয়ার উপর ইরানের প্রভাব কমে যাবে। কারণ বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ চিন্তা করলে সিরিয়া হয়ে হেজবুল্লাহর যে রুট সেটা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিতে চাইবে না ইরান। আর এটাও অস্বীকার করা যাবে না, পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেক কায়দা করেও সিরিয়া থেকে ইরানের প্রভাব কমাতে পারেনি।

গত নভেম্বর মাসেই ভিয়েনা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল ইরানের একদল প্রতিনিধি। সিরিয়ার বাস্তবতায় রাশিয়ার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইরানের প্রতিনিধিদের যোগাদান ছিল মোটামুটি ঐতিহাসিক। কারণ এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও ভিন্ন কোনো বর্হিদেশিয় কোনো ইস্যুতে তারা এর আগে একত্রিত হয়নি। ওই সম্মেলনে ইরানের প্রতিনিধি দল এটা পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন যে, পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন আপত্তি থাকা স্বত্ত্বেও তারা সিরিয়ার বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থের কথা চিন্তা করে আসাদ বিরোধী এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবে। যদিও সিরিয়া প্রশ্নে আয়োজিত আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। কিন্তু এটা উল্লেখ্য যে, আলোচনার টেবিলে ইরান আসার মানে রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া।

তাই বলে কি ইরান স্বার্থহীন? রাশিয়া যেমন তার সর্বোচ্চ স্বার্থ নিয়ে সিরিয়াতে প্রবেশ করেছে তেমনি ইরানও তার স্বার্থের বাইরে নয়। প্রথমত, সিরিয়াকে দীর্ঘবছর ধরেই অর্থনৈতিক প্রনোদনা ও সহায়তা দিয়ে আসছে ইরান। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি কোনো কারণে আসাদ সরকারের পতন হয় তাহলে ওই বিপুল পরিমান অর্থ সিরিয়া থেকে উঠানো ইরানের পক্ষে সম্ভব হবে না। যদিও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সিরিয়ার উৎপাদিত তেলের বিশাল অংশই অর্থের বিনিময়ে চলে যাচ্ছে ইরানে। তাই কোনো মতেই এটা ভাবা ঠিক হবে না যে, সিরিয়া থেকে পাত্তারি গুটাতে যাচ্ছে ইরান, উল্টো নতুন কৌশলে তারা আগাতে পারে রাশিয়াকে সামনে রেখে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: বিদেশী খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*