শিরোনাম

হিরোশিমায় পরমাণু বোমা ফেলার কারণ

2016_05_28_13_38_13_lA1hpMdossDdQhXmL1B44lfHbx8WNU_originalগত শুক্রবার এক ঐতিহাসিক সফরে জাপানে গেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনী জাপানের দুটি প্রসিদ্ধ নগরকে পরমাণু বোমার সাহায্যে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবার পর আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাপানে আসেনি। দীর্ঘ বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামা হিরোশিমা সফরে আসলেও তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের কৃতকর্মের জন্য কোনো ক্ষমা চাননি। ওবামা ক্ষমা চাইবেন কি চাইবেন না, এনিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষদের মধ্যেই শুরু হয়েছিল নানান তর্ক-বিতর্ক। তবে এটা উল্লেখ করার মতো ব্যাপার যে, আজও মার্কিন জনগণ জাপানকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে এবং দেশটিতে দুটো পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ নিয়ে তাদের মধ্যে নেই কোনো অপরাধবোধ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিরোশিমার যে উদ্যানটিতে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের প্রতি সম্মান জানান সেই উদ্যানটির নাম পীস মেমোরিয়াল পার্ক। জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় হনসু দ্বীপে অবস্থিত এই পার্কটিতেই সেদিন মার্কিন বি-২৯ বিমানের পেট থেকে নেমে এসেছিল ভয়ংকর পরমানুষ বোমা। তৎকালীন সময়ে এই স্থানটি ছিল পুরোপুরি ব্যস্ত এক বাণিজ্যিক এলাকা। পরমাণু বোমা আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিছু চিহ্ন আজও জাপানিরা সংরক্ষণ করে রেখেছে নিজেদের উপর বর্হিশক্তির পাশবিকতার চিহ্ন হিসেবে। হিরোশিমা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোমোশন হলটি সেদিন বোমার আঘাতে স্রেফ কঙ্কাল হয়ে গিয়েছিল। সেই হলটি আজও সাধারণ মানুষদের জন্য রেখে দেয়া হয়েছে এবং ইউনেস্কো এই হলটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে ১৯৯৬ সালে।

বর্তমানে হিরোশিমার জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। কিন্তু ১৯৪৫ সালে এই শহরেরই লোকসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ। জাপানের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি নামক ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান নিজে হিরোশিমায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার নির্দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের এনোলা গে নামের বি-২৯ বিমানটি ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ নামক পরমাণু বোমাটি নিক্ষেপ করে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ওই বোমা হামলার মতো ভয়ংকর আর সর্বগ্রাসী বোমা হামলার ঘটনা আর নেই।

১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মান নাৎসি বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। এর ঠিক একমাস পরেই আমেরিকান বিজ্ঞানীরা সফলভাবে ম্যানহাটন প্রকল্প শেষ করে। এই প্রকল্পের আওতায় তারা সফলভাবে পারমাণবিক বোমা নির্মানে সক্ষম হয়। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান যুদ্ধবিষয়ক সচিব হেনরি স্টিমন্সকে সদ্য আবিষ্কৃত পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা ক্ষেত্র কোথায় হতে পারে তা নিরুপন করতে বলেন এবং সেটা যেন জাপানে হয় সেব্যাপারেও নির্দেশ দিয়েছিলেন। হ্যারি ট্রুম্যানের লাইব্রেরি থেকে জানা যায়, ওই সময় মার্কিন সিনেট এবং যুদ্ধবিষয়ক কমিটির মধ্যে জাপানে বোমা ফেলার ব্যাপারে বিপুল সমর্থন ছিল। স্টিমন্সই ছিলেন সবচেয়ে বেশি আগ্রহী বোমা ফেলার ক্ষেত্রে।

জার্মানির পতন ঘটলেও জাপান অতটা সহজে আত্মসমর্পন করতে রাজি ছিল না। কারণ ভৌগোলিকভাবে জাপানের অতটা ভাবনারও কারণ ছিল না। অবশ্য জাপান আত্মসমর্পন করলেও সেটা নিঃশর্তে করতো না এটা নিশ্চিত ছিল। কারণ ওরকম একটি বোমা গোটা যুদ্ধ নয়, পুরো দেশের মানচিত্রে পরিবর্তন এনে দিতে পারে সেটা অনুধাবনে ছিল না জাপানিদের। তাই যখন হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পরপর দুটো পরমাণু বোমা হামলা চালানো হলো তখন জাপানিদের আর আত্মসমর্পন করা ছাড়া উপায় থাকলো না।

যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানি সেনাবাহিনীর জন্য লো জিমা জিমা এবং ওকিনওয়ার যুদ্ধ অনেক ক্ষয়ক্ষতি এনে দিয়েছিল। এছাড়াও জাপানি বিমান এবং নৌবাহিনীকে রীতিমতো ভয়ই পেত মার্কিন বাহিনী। কারণ মার্কিন বাহিনীর মধ্যে একটা প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, সর্বশেষ জাপানি যোদ্ধাও চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে। বর্তমানে আমরা অহরহই আদমবোমা হামলার খবর শুনতে পাই। কিন্তু তৎকালীন সময়ে আদমবোমার প্রচলন অতটা না থাকলেও জাপানি যোদ্ধারা একপ্রকার আত্মঘাতী হামলা চালাতো যাকে জাপানি ভাষায় বলে ‘কামিকাজে’। ওই হামলাগুলোই মূলত মার্কিন প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছিল সেসময়। মোটকথা, ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যদি পরমাণু বোমার প্রয়োগ না করতো তাহলে মার্কিনীদের হয়তো পরাজয় বরণ করতে হতো জাপানের কাছে।


হিরোশিমায় বোমা হামলাকারী বিমান ও এর ক্রুরা

হিরোশিমার হামলায় তাৎক্ষণিকভাবেই ৭০ হাজার মানুষ মারা যায়। পরবর্তীতে আরও ৭০ হাজার মানুষ বিভিন্ন সময় মারা যায় যারা প্রত্যক্ষভাবে বোমা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বোমা হামলার পাঁচ বছরে এই মৃতের সংখ্যা দ্বারায় প্রায় দুই লাখে। মৃত্যুর বাইরে অগুনতি মানুষের শরীরে মরনঘাতী ক্যান্সার ছড়িয়ে যায়। বহু মা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম দিতে থাকেন রেডিয়েশনের প্রভাবে। হিরোশিমা আর নাগাসাকির বোমা হামলা পরবর্তী বর্ননা দেয়া এতটা সহজ নয়, যেখানে মানুষের সৃষ্ট ইতিহাসে এরচেয়ে বড় বর্বরতা আর নেই।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ফিচার

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*