শিরোনাম

সৌদি-‘যুক্তরাষ্ট্র’-ইরান

2016_01_06_13_32_29_mkVBrNstcTF2FgnizNNZic2EytSnOb_originalসৌদি আরব-‘যুক্তরাষ্ট্র’-ইরান। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত এই তিনটি দেশ। রাজনৈতিক অঙ্গণে সৌদি আরব ও ইরাণ এখনও রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদী কাঠামোতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তার নীতি সাজিয়েছে গণতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে সৌদি ও ইরান রাষ্ট্রধর্মের দিক দিয়ে ইসলামিক দেশ হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হলো খ্রিষ্ট। অর্থাৎ রাজনীতির ও ধর্মতাত্ত্বিক কোনো বিচারেও সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিল নেই। তবু কেন এই দুটি দেশের মাঝে বারবার আলোচনায় আসছে যুক্তরাষ্ট্র? এখানে যদি উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাস্তবতা তুলে ধরা যায় তাহলে বিষয়টা কিছুটা আলোর মুখ দেখতে পায়। দেশ হিসেবে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া পৃথক হয়েছে যে সীমান্তে, সেই সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্র আজ বহু বছর ধরেই প্রায় আশি হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে। কিন্তু কেন এই সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আজ অবধি কেউ জানে না। যদিও প্রতিবছর জাতিসংঘে এনিয়ে উত্থাপিত বক্তব্যে ওই সৈন্য মোতায়েনকে ওই অঞ্চলের শান্তি সুরক্ষার শর্ত হিসেবে দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

তেহরান এবং রিয়াদ ইস্যুতে ওয়াশিংটন যে ভূমিকা পালন করছে তা খতিয়ে দেখা অবশ্যই দরকার। বহু বছর ধরেই নানান ইস্যুতে তেহরান ও রিয়াদ একে অপরের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করে আসছে। কখনও তা মানবিক পর্যায়ভুক্ত আবার কখনও আন্ত:দেশিয় রাজনীতির অংশ হিসেবে। তবু বর্তমান সঙ্কটের সময় এই দুটি দেশ এমন একটি রেখায় দাড়িয়ে আছে, যেখান থেকে বৃহত কোনো যুদ্ধ বা ভয়াবহ ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে শিয়া নেতা নিমর আল নিমরের শিরশ্ছেদকে সৌদি আরবের যুদ্ধকেন্দ্রিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগেও সৌদি আরব উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় একই কায়দায় ইরানকে জড়িয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই কি সৌদি আরব একই কায়দায় বেঁচে যাবে?

সৌদি আরব খুব ভালো করেই জানতো যে নিমরের শিরশ্ছেদ গোটা শিয়া সমাজে আলোড়ন তুলবে এবং এনিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা হবে। ইরান সহজে এই বিষয় ছেড়ে দেবে না তাও সৌদি আরব নিশ্চিত জানতো। আর এই জানা বোঝা থাকার কারণেই রিয়াদ যে এই ঘটনাটির জন্ম দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত বাস্তবতায় পৌছায় যখন তেহরানে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় একদল শিয়া মতাবলম্বী। সৌদি দূতাবাসের ওই আগুন শুধু একটি দালানই পোড়ায়নি, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্ত মিত্রদের একাংশও সৌদি আরবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইরানের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

ইরানের দৃষ্টিতে সৌদিরা তাদের দেশে এবং দেশের বাইরের শিয়াদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে ইরানের অন্যতম মিত্র হলো সিরিয়া ও এর প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। সিরিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশটির পাশে ইরান দাড়ানোয় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থে কতটা আঘাত হেনেছে, তারচেয়েও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত লেগেছে বেশি। যে কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে বারবার স্থিতিশীলতার কথা বলছেন। যদিও সৌদি আরবের প্রতিই রয়েছে মার্কিনীদের শতভাগ সমর্থন। কিন্তু সৌদি আরবের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই সুবিধাভোগী চরিত্রের কারণ ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রকে আর শতভাগ বিশ্বাস করতে চাইছে না রিয়াদের শাসকরা।

কিন্তু বৃহদার্থে দেখা গেলে, ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র তারা নীতি পরিবর্তন করেছে মূলত ইরাক যুদ্ধকালীন সময়েই। কারণ ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল চলতে থাকলেও, কোনো অর্ন্তবর্তীকালীন শাসককেই বৈধতা দেয়নি ওয়াশিংটন। কিন্তু যখনই নুরী আল মালিকি ও তার সমর্থকরা বাগদাদ দখল করলেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতা কায়েম করলেন তখনই এই সরকারকে বৈধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের প্রতি মালিকির(শিয়া) ইরাক ছিল মূলত উপহার স্বরূপ। সৌদি আরবের সালাফি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা ইরাকের এই পটপরিবর্তনে শঙ্কিত হয়ে যায়। যে কারণে রাতারাতি সুন্নি মুসলিমদের নিয়ে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ‘দায়েশ’ গঠিত হয়ে যায় একেবারে ইরাকের বুকের মাঝে এবং বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ত্রাস এই সংগঠনটি।

দায়েশের উত্থানের এক পর্যায়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি হয়ে গেলে আবারও চাপের মধ্যে পড়ে সৌদি আরব। কিন্তু তখন আর ইরান ইস্যুতে রিয়াদ রাজতন্ত্রের কোনো কিছু করার ছিল না। কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত সৌদি রাজতন্ত্রকে যে নীতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই নীতিই দেশটিকে ইয়েমেনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় এবং ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া হুতি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামে রিয়াদ। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরব তেমন সুবিধা না করতে পেরে বিশ্বের বিভিন্ন সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করে।

মূলত দ্বন্দ্বটা সুন্নি-শিয়া বা সৌদিআরব-ইরান নয়। দ্বন্দ্বটা ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্রের। পারসিয়ান সভ্যতা বহু যুগ ধরেই নিজেদের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে। ইরানে ইসলামিক বিপ্লব পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত দেশটির উপর যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রভাব ছিল, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তা কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। যে কারণে বৃহত রাষ্ট্র ইরান গোটা মধ্যপ্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট ভরকেন্দ্রে পরিনত হয়। এই ভরকেন্দ্রকে সামনে রেখে বেশকিছু রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান জারি রাখে, যা প্রকারান্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাগরশাসন ও তেলশাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দিকে একের পর এক শত্রু ঠেলে দিয়েছে দেশটিকে কাবু করতে। কখনও সেক্ষেত্রে তারা ইরাককে ব্যবহার করেছে, কখনও জর্ডানকে। তবে সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে সৌদি আরব। যেহেতু এক হাজার বছর ধরে একটা ধর্মতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যে চলছিল এবং যখনই ধর্মতাত্ত্বিক লড়াই রাজনীতির মাঠে গড়ায় তখনই এর সুযোগ গ্রহন করে যুক্তরাষ্ট্র।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ফিচার

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*