শিরোনাম

সোনাগাছি: স্বাধীন রাষ্ট্রে পরাধীন শহর

2016_02_14_13_57_59_J34I1dbdOY194wC3Q7sNkvTW4ZLUxw_originalকলকাতার সোনাগাছি এক ক্ষমাহীন প্রশ্রয়ের নাম। পুরো এলাকার শরীর জুরে থাকা সরুগলিগুলো যেন শিরা উপশিরা হয়ে এই অঞ্চলের তিনশ বছরের ইতিহাস বলে যাচ্ছে। আর এই বাস্তবতা আমাদের সামনে এমন একটি সত্য উপলব্ধি এনে দেয় যা গোটা স্বাধীনতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। উপনিবেশিক আমলে কলকাতা ও তদসংলগ্ন বিশাল অঞ্চলের বাবুয়ানি প্রথার টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই তৈরি করা হয়েছিল এই বিশাল যৌনপল্লী। আজও ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে সোনাগাছি হাজারো রজনীর গল্প বলে যায় আমাদের সকলের চর্তুপাশে।

কলোনিটির নাম হলো সোনাগাছি। শব্দটির আভিধানিক অর্থ করলে দাড়ায় ‘স্বর্ণের গাছ’। স্থানীয় প্রবাদে আছে যে সোনাগাছি কলোনির পাশে শিবমন্দির নিকটবর্তী এক স্থানে সানাউল্লাহ গাজী নামের এক সাধুকে সমাহিত করার পর থেকেই এই এলাকাটিকে আলাদা ঘোষণা করা হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী সোনাগাছিতে বর্তমানে প্রায় ১৮হাজার নারী বাস করছেন। পুরো কলোনিটি এতটাই ঘিঞ্জি যে সারাক্ষনই কোনো না কোনো জাগ্রত চোখ আপনাকে দেখতেই থাকবে। বহুতল ভবনগুলোর প্রত্যেকটি জানালা যেন স্বাধীন হবার পায়তারা নিয়ে তাকিয়ে আছে বহু বছর ধরে। আর এই ছোট্টো শহরটিতে আনন্দের কোনো কমতি নেই, সারাক্ষনই আনন্দ আর হৈ-হুল্লোর লেগেই থাকে।

কলোনির দালানগুলোর অদ্ভুত সব নাম। নীল কমল, লাল কমল, প্রেম কমল, গঙ্গা কমল, গঙ্গা যমুনা, নন্দ রানীর বাড়ি ইত্যাদি সব চকটদার নামগুলো নেয়া হয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন চলচ্চিত্র থেকে। নীল এবং লাল কমল বাড়ির অধিকাংশ নারীরাই হয় মারোয়ারি। যে সমস্ত খদ্দেররা মুসলিম এবং মারোয়ারি নারীদের পছন্দ করে তারাই সচরাচর ওই বাড়িগুলোতে যান। এরকম প্রত্যেকটি বাড়ির নামকরণ করা হয় ওই বাড়িতে কোন ধরণের মেয়েদের পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে।

খদ্দেরদের কাছ থেকে ওই বাড়ির বাড়িওয়ালারা এক রাতের জন্য আট হাজার রুপি পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। স্থানীয় এক বালকের ভাষ্য অনুযায়ী, আট হাজার টাকা নিলেও বাড়িওয়ালিরা খদ্দেরকে এক ঘণ্টা পরেই বের করে দিতে পারে চাইলে। এই বালকটির কাছেই জানা যায়, নন্দরানীর বাড়ির নারীরা সকলেই বাঙালি এবং নেপালি। পুরো সোনাগাছির মধ্যে নন্দরানীর বাড়ি বেশ বিখ্যাত বাঙালি খদ্দেরদের কাছে।

সোনাগাছিতে ঘুরে বেড়ানোর অবসরেই একটি বিষণ্ন চেহারার মেয়ে এগিয়ে আসছিল। যার ছোট্টো মুখটিতে বেঢপাকার নাকছাবিটা যেন গোটা সোনাগাছির বৈসাদৃশ্যময় পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। খদ্দেরদের আকর্ষণ করার জন্য কালো চামড়ার জিনস এবং বুট পরিহিত মেয়েটি সামান্য এগিয়ে এসে বললো, ‘আমাদের ভেতর বিশেষ কিছুই নেই, তোমাদের যখন ক্ষুধা লাগে তখন তোমরা খাও।’ এরপর হাসতে হাসতে পাশ দিয়ে চলে গেল মেয়েটি।

পুরনো গলিগুলোর পরিবেশ বেশ মাদকতাময়। হাটতে থাকলে মনে হবে আকাশ থেকে ঝুলে থাকা লাল ও গৈরিক রংয়ের কাপড়গুলো আহ্বান করছে একে অপরকে। গলি লাগোয়া ব্যালকনির প্রান্তে জ্বলতে থাকা নিভু নিভু নিয়ন আলোগুলোর ছায়ারা রাতভর নৃত্যরত থাকে অজস্র মানুষের ভিড়ে। যৌনকর্মীদের দালাল আর লাস্যময় কথাবার্তা এড়িয়ে সামনের বিচিত্র সব রং পেরিয়ে যেতে যেতে সামনে প্রায় হঠাৎ করেই যেন উপস্থিত হবে শান্তি প্রাসাদ।

প্রাসাদের প্রবেশ পথেই মিলবে নানান নকশায় করা আলপনা আর ফুলের সমাহার। গোটা বাড়িটি দেখলে প্রথমে মনে হতে পারে এটা কোনো একক পরিবারের বাড়ি। কারণ বাড়ির মধ্যিখানে এখনও সেই সাবেক আমলের কায়দায় পূজোর জন্য রয়েছে আলাদা স্থান। পূজোর স্থান পেরিয়ে একটু আগালেই দেখতে পাওয়া যায় রান্নার ঘর। আমার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ছিল একজন। ভেতরে প্রবেশের আগে সে বারবার বলছিল, ‘আমাকে বাইরে রেখে যাবেন না। আমি যদি তাদের প্রস্তাবে সাড়া না দেই তবে তারা আমাকে লাঞ্ছিত করবে।’ অথচ পুনম প্রায় পঁচিশ বছর ধরে এখানে যাতায়াত করেন। তার ভাষ্য মতে, ‘আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার পর এই স্থানে আসি এবং সপ্তাহে একবার আমার ছয় সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তারা আমার মায়ের সঙ্গে বাস করে এবং এখানে আমার অংশীদার হলো বাবু। সেই আমাকে রান্না করে দেয় এবং এখান থেকে যা অর্জন করে তা নিজের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়।’

প্রমীলা সিং সোনাগাছিতে আজ ৪০ বছর ধরে আছেন। তার নিজের মেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরেও যদি মায়ের পেশায় আসতে চায় তাহলে মা হিসেবে বাঁধা দেবেন না প্রমীলা। তার শিক্ষিত মেয়ে ইতোমধ্যেই স্থানীয় কিছু সংস্থার সদস্য হয়েছেন এবং বেসরকারি সংস্থার হয়েও কাজ করেন। ওই সংস্থাগুলো শিশুশ্রম, এইচআইভি-এসটিডি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে।

সোনাগাছিতে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকগুলো বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা কাজ করছে অনেক বছর ধরেই। এই সংস্থাগুলো খদ্দেরদের কাছ থেকে কি পরিমান অর্থ নেয়া যেতে পারে এবং যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সেবাও তারা নিশ্চিত করে। উষা ব্যাংক, উষা মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটি হলো তেমনি একটি সংগঠন। ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মাঝে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। বিশেষত, খদ্দেরদের হাতে যৌনকর্মীদের লাঞ্চিত হওয়ার কয়েকটি ঘটনার পর বেসরকারি সংস্থাগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় কিছু অলিখিত নিয়ম জারি করেছে পুরো কলোনি জুরে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ফিচার

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*