শিরোনাম

দর্শনের বস্তুবাদী ধারার সঙ্গে ধর্মের নৈকট্য কম, বিজ্ঞানের নৈকট্য বেশি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: প্রায় সব তৃষ্ণারই তৃপ্তি আছে, তবে বিশেষভাবে নেই দুটির, জ্ঞানের এবং ভক্তির। এই দুটি আবার পরস্পরবিরোধী। জ্ঞান ভক্তিকে দুর্বল করে, ভক্তি জ্ঞানকে প্রতিহত করতে চায়। আমরা যখন দর্শনের চর্চার প্রসঙ্গে আসি তখন জ্ঞানের ওপরই জোরটা পড়ে, ভক্তির ওপরে নয়।
দর্শনের উৎসে থাকে কৌতূহল, যাকে বলা চলে জিজ্ঞাসা। জিজ্ঞাসা থেকেই জ্ঞানান্বেষণের সূত্রপাত। জ্ঞান আবার ব্যাখ্যাও করে। পুরাতন ব্যাখ্যা নতুন ব্যাখ্যার জন্য পথ ছেড়ে দেয় এবং ওই পথে জ্ঞান ও ব্যাখ্যা উভয়েই এগিয়ে যায়। বোঝা যায় এই যাত্রার শেষ নেই। দর্শন বিভিন্ন ধরনের। আমরা বলি এবং মানি যে, সব উল্লেখযোগ্য বিষয়েরই একটা দর্শন থাকে। তবে এটাও জানি আমরা যে, দর্শনের সংখ্যা অসংখ্য হলেও দর্শনচর্চার ধারা দু’টি- একটি ভাববাদী, অপরটি বস্তুবাদী। বস্তুবাদী ধারাটি বস্তুকেন্দ্রিক নয়, বস্তুর দ্বারা সেটি আকীর্ণ নয়; তবে বস্তুজগতের ওপর নির্ভরশীল বটে। এই ধারাকে ইহজাগতিক বললেও হয়তো আপত্তি থাকবে না।pic
জ্ঞানের ক্ষেত্রে বস্তুর সঙ্গে মনের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত পুরাতন এবং প্রায় প্রাথমিক প্রশ্ন। বস্তু বড় না মন বড়, এ প্রশ্নটি উঠেছে। প্রশ্নটির তাৎপর্য হল এই বিবেচনা যে, বস্তু মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নাকি মনই তার নিজস্ব উপায়ে বস্তুর ধারণা, ব্যাখ্যা, তাৎপর্য সবকিছু তৈরি করে নেয়। আর এই জিজ্ঞাসার মীমাংসা করতে গিয়েই দর্শন পরস্পরবিরোধী দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে, যাদের একটি ভাববাদী, অন্যটি বস্তুবাদী। তবে ভাববাদী হোক কি বস্তুবাদীই হোক, দার্শনিক জ্ঞানের আহরণভূমি হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও চিন্তা। অভিজ্ঞতা ও চিন্তা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি সামাজিক, একাধারে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক, অতীতের হয়েও বর্তমানের।
দর্শনের ভাববাদী ধারার সঙ্গে ধর্মের বিলক্ষণ নৈকট্য আছে। ধর্ম এক সময়ে দর্শনের জায়গাটা দখল করে রেখেছিল। দর্শনের মতোই ধর্ম, জগৎ ও জীবনের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে এবং যেমনটা দর্শন করে থাকে তেমনি তত্ত্ব নির্মাণ করেছে। ধর্ম অবশ্য একটা অতিরিক্ত দায়িত্ব নেয়, সেটা হল ব্যক্তির জন্য নৈতিকতা ও আচরণের নিয়মবিধি তৈরি করে দেয়া। তবে দর্শন যে নৈতিকতা-নিরপেক্ষ তা নয়, ধর্মের মতো দর্শনও ক্ষমতা রাখে মানুষকে বদলে দেয়ার। কিন্তু ধর্ম যেভাবে মানুষকে শাসন করে দর্শনের জন্য সেটা স্বভাবসিদ্ধ নয়। ধর্মের সঙ্গে দর্শনের প্রধান দূরত্বটা এখানে যে ধর্ম জোর দেয় বিশ্বাসের ওপর, সেই সঙ্গে সে দাবি করে ভক্তির। তাছাড়া এটাও তো দেখা গেছে যে, ধর্মবিশ্বাসীরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর চড়াও হয়; কারণ তারা নিজেদের বিশ্বাসের জগৎটাকেই জগৎশ্রেষ্ঠ বলে ধরে নেয়। অপরদিকে দর্শনে থাকে সংশয়, তার নির্ভরশীলতা যুক্তি, প্রমাণ, বিবেচনা, বিতর্ক ইত্যাদির ওপর।
দর্শন এখানে বিজ্ঞানের বন্ধু ও সহযাত্রী। তবে পার্থক্য এ দুয়ের ভেতরও রয়ে যায়। সেটা ঘটে এই জন্য যে, দর্শনের তুলনায় বিজ্ঞান অধিকতর প্রায়োগিক। বিজ্ঞানেও তত্ত্ব থাকে, কিন্তু বিজ্ঞান তার তত্ত্বকে কখনোই প্রয়োগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না, প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে পরীক্ষা করে নিতে চায় এবং এভাবেই গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সে জন্য দেখা যায় দর্শনের চেয়ে বিজ্ঞানের চলিষ্ণুতা অধিক। বিজ্ঞানের আবিষ্কার উদ্ভাবনার কোনো শেষ নেই। তৃপ্তি কাকে বলে বিজ্ঞান তা জানে না। যত তার জ্ঞান বাড়ে তত বৃদ্ধি পায় কৌতূহল। বিজ্ঞান ধরে নেয় যে, শুধু আহরণ নয়, বিতরণেও জ্ঞান বিকশিত হয়।
দর্শনের বস্তুবাদী ধারার সঙ্গে ধর্মের নৈকট্য কম, বিজ্ঞানের নৈকট্য বেশি। বিজ্ঞানের মতোই বস্তুবাদী দর্শনও অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে তত্ত্বে পৌঁছায় এবং তত্ত্বকে পরীক্ষা করে। এভাবেই পথ কেটে বস্তুবাদী দর্শনের অগ্রগমন। নিজে সে বদলায়, বিশ্বাসীদেরকেও বদলে দেয়। এই দর্শন বস্তুজগৎকে গুরুত্ব দেয় ঠিকই, কিন্তু তাই বলে মনোজগৎকে মোটেই অস্বীকার করে না। তার বক্তব্যটা মোটামুটি এই রকমের যে, মানুষের মনই ধ্যান-ধারণা ও বস্তুজগতের ব্যাখ্যা তৈরি করে, মনেই থাকে জ্ঞানের সঞ্চয় এবং ঘটে ভাবনার উদয়, সেখানেই চিন্তার ধারা-উপধারায় মিলন বিরোধ। মনের আপেক্ষিক স্বাধীনতাও রয়েছে, মনই কল্পনা করে এবং কল্পনা ছাড়া সৃষ্টি সম্ভব নয়। কিন্তু বস্তুবাদী দর্শন কখনোই এটা মানবে না যে মন সার্বভৌম। বলবে মানুষের মন তার জাগতিক অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলোর ভেতর রয়েছে অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, ভূগোল- এককথায় বস্তুজগতের সবকিছুই। বস্তুগুলো ইহজাগতিক এবং এরা মনের গতিপথ ও গতিধারার ওপর কর্তৃত্ব করে। এ জন্য দেখা যায় একই পরিবারের দু’জন সদস্য যদি এমনকি একই ছাদের নিচেও থাকে তবু তাদের অর্থনৈতিক জীবন যদি দু’রকমের হয়- একটি ধনী, অপরটি গরিব- তাহলে তাদের চিন্তাধারা দু’রকমের হতে বাধ্য। শীতের দেশের স্বর্গকল্পনা আর গরম দেশের স্বর্গকল্পনা যে অভিন্ন নয় সেও তো আমরা জানি। বস্তুবাদী দর্শন ও বিজ্ঞানের এই নিকটবর্তিতা তাদের উভয়কেই চিনতে সাহায্য করে। উভয়ের ক্ষেত্রেই দু’টি চালিকাশক্তি কার্যকর থাকে, যাদেরকে স্থায়ী সত্যও বলা চলে। একটি হচ্ছে কার্যকারণ, অপরটি দ্বন্দ্ব। কারণ ছাড়া যে কার্য নেই, এটা সবারই জানা, কিন্তু সাধারণ আলাপ-আলোচনায় দ্বন্দ্বের বাস্তবতাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়া হয়। দ্বন্দ্ব আসলে কার্যকারণের চেয়েও অধিক সত্য। সব কিছুর ভেতরই দ্বন্দ্ব আছে। দ্বন্দ্বই মূল চালিকাশক্তি। ঐক্যের ভেতর দ্বন্দ্ব থাকে; দ্বন্দ্ব পুরাতন ঐক্যকে ভেঙে দিয়ে নতুন ঐক্য তৈরি করে। ঐক্য, বিরোধিতা, ঐক্য- এভাবেই অগ্রগতির দ্বারা অব্যাহত থাকে। এমনকি মালিক ও শ্রমিকের ভেতরও একটা ঐক্য দেখা দেয়, কারণ উভয় পক্ষই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত; কিন্তু তাদের ভেতর দ্বন্দ্ব অপরিহার্য, কেননা শ্রমিকরা উৎপাদন করে সামাজিকভাবে, কিন্তু উৎপাদিত বস্তু চলে যায় ব্যক্তিগতভাবে মালিকের দখলে। মালিকে-শ্রমিকে এই দ্বন্দ্বের মীমাংসাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। মালিকপক্ষ ছাড় দিতে বাধ্য হয়, কিন্তু তাতে দ্বন্দ্বের নিরসন হয় না, নিরসনের জন্য আবশ্যক হয় এমন ব্যবস্থার সেখানে মালিকানাটা সামাজিক হবে, মালিকে-শ্রমিকে পার্থক্য থাকবে না।
ওদিকে দ্বন্দ্ব আছে বলেই মানুষের সভ্যতা এগোয়। এমনকি পাখি যখন আকাশে ওড়ে তখন তার পক্ষেও অপরিহার্য হয় পাখা দিয়ে বায়ুমণ্ডলে আঘাত করার। সমাজে, রাজনীতিতে, মানুষের মনে সর্বত্র দ্বন্দ্ব আছে, ছিল এবং থাকবে। প্রেমের সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে গ্রিক দার্শনিকদের এরকম উক্তি পাওয়া যায় যে, এক সময়ে পুরুষ ও নারী একই দেহে ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় ছিল; দেবতারা দেখল এই অখণ্ডতা দেবতাদের স্বার্থের জন্য বিপজ্জনক, কেননা অখণ্ড মানুষ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে চায় দেবতাদের, অতএব তারা ঠিক করল যে, মানুষকে বিভক্ত করা চাই। সেটাই তারা করেছে, আলাদা করে দিয়েছে পুরুষ ও নারীকে। সেই থেকে মানুষের ওই দুই সত্তা এক হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। এই গল্পের সঙ্গে যোগ করা যায় এই কথাটাও যে, এক্ষেত্রেও ঐক্যের আকাক্সক্ষা দ্বন্দ্বের সম্ভাবনাকে যে নির্মূল করে দেয় তা নয়। দ্বন্দ্ব না থাকলে সাহিত্যসহ সব শিল্পকলার উৎকর্ষ যে ব্যাহত হতো তাতে সন্দেহ কী!
আমরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলি, তাই বলে দ্বন্দ্বের ভেতর যে দ্বিধা আছে তা নয়; দ্বিধা যা তা মানুষের, দ্বন্দ্বের নয়। মানুষ সাধারণত চায় দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে। কিন্তু পারে না। যে জন্য নানা রকমের সংঘর্ষ বাধে; কিন্তু তার ভেতর দিয়েই মানুষের পক্ষে সামনে এগুনো সম্ভবপর হয়। দার্শনিক চিন্তাও দ্বন্দ্বের কারণেই এগোয়। ভাববাদী দর্শন দ্বন্দ্বের বাস্তবতাকে ততটা গুরুত্ব দিতে নারাজ, বস্তুবাদী দর্শন যতটা দেয়। অভিজ্ঞতা বলে পরস্পরবিরোধী উপাদানের উপস্থিত বস্তুর অস্তিত্বের শর্ত বৈকি। যে জন্য নিচু না থাকলে উঁচু থাকে না। ভালো-মন্দের ব্যাপারেও দেখি মন্দ আছে বলেই আমরা ভালোকে চাই এবং ভালোর আলোকেই মন্দকে চিনি, যেমন মন্দের অন্ধকারের দরুন ভালোর উজ্জ্বলতা চোখে পড়ে।
২.
দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অগ্রগতি এবং জ্ঞানান্বেষণে সন্তোষের অনুপস্থিতি, এরা একসঙ্গে চলে; কিন্তু তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধক থাকে। কারা এই প্রতিবন্ধক তৈরি করে? করে কায়েমি স্বার্থ। যে স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে সেটি নানাভাবে দ্বন্দ্বের বিকাশে ও জ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা দেয়- সামনাসামনি দাঁড়ায়, আবার গোপনেও তৎপরতা চালায়। এককালে রাজা ছিল, রাজা চেয়েছে প্রজারা চিন্তাশক্তি বিবর্জিত হোক, তারা কেবল মান্য করে চলুক। প্রজারা চিন্তা করলেই নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে অসন্তুষ্ট হবে, হয়তো বিদ্রোহ করবে, রাজার সঙ্গে প্রজার দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। এক সময়ে রাজতন্ত্র চলে গেছে, তার জায়গায় নতুন ধরনের রাষ্ট্র এসেছে, এসেছে রাষ্ট্রের কর্তারা, তারা নিজস্ব ব্যবস্থা কায়েম করেছে। তাদের নতুন ব্যবস্থাও পুরাতন ব্যবস্থার মতোই দার্শনিক চিন্তার অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেছে। কায়েমি স্বার্থ ধর্মকে কাজে লাগায়। রাজারা বলেছে, তারা ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে এসেছে, তাই প্রজাদের কর্তব্য তাদের নীরবে মান্য করা। এ কাজে তারা সমর্থন পেয়েছে পুরোহিততন্ত্রের; একই কারণে, উভয় পক্ষের বস্তুগত স্বার্থরক্ষার অভিপ্রায়ে। তাই দেখা যায়, দার্শনিকদের ভেতর যারা ইহজাগতিক, যাদের চিন্তা ক্ষমতাবানদের স্বার্থের জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়, তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা তো বটেই, কখনো বিষ খাইয়ে কখনো বা পুড়িয়ে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।
মূল চরিত্রে সব শাসকই স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী, তারা সবাই ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে পবিত্র জ্ঞান করে এবং তার মহিমা প্রচারের জন্য দর্শনকে ব্যবহার করে। বিজ্ঞানকেও তারা ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থরক্ষার কাজে। বিজ্ঞানের উদ্ভাবিত মাধ্যমগুলোর সাহায্যে তারা নিজেদের গৌরব প্রচার করে। একই সঙ্গে তারা বৈজ্ঞানিক অস্ত্র ও কলাকৌশলের সাহায্যে বিক্ষোভকে দমন এবং বিক্ষুব্ধ মানুষকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করতে সচেষ্ট থাকে। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তারা উপনিবেশ গড়ে এবং সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটায়।
প্রতিষ্ঠিত স্বার্থ তার শাসন বজায় রাখার প্রয়োজনে মানুষের অগ্রগতি ও মুক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় এবং ইহজাগতিক দর্শন ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঙ্গে শত্র“তা করে। সভ্যতার অগ্রগতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে এই
কায়েমি স্বার্থের নাম বদলেছে, চেহারা ও ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু তার স্বভাব বদলায়নি। আধুনিক যুগে মানুষের অগ্রগতির পথে যে বৈরী শক্তিটি প্রধান প্রতিবন্ধক তার নাম পুঁজিবাদ। ওই নামে চিনলে তার আচার-আচরণের রূপ ও ধরন বুঝতে অসুবিধা থাকে না। পুঁজিবাদই এখন বিশ্বকে শাসন করছে। এটি একাধারে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং দার্শনিক আদর্শ। এ ব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রকাশটি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, যা এখন বিশ্বময় মানুষের এবং মনুষ্যত্বের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন ও শোষণ অব্যাহত রেখেছে।
এটা স্বীকৃত সত্য যে, এক সময়ে পুঁজিবাদের একটি প্রগতিশীল ভূমিকা ছিল। সামন্তবাদের সংকীর্ণতার নিগড় থেকে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং মানুষকে সে মুক্তি দিয়েছিল। যার ফলে মানুষের চলাচল এবং চিন্তা ও কাজের জগৎ প্রসারিত হয়েছে। মানুষ আধুনিক হয়ে উঠেছে। এই আধুনিকতার দার্শনিক কাজটা ছিল ধর্মের শাসনকে সঙ্কুচিত করে দিয়ে ইহজাগতিকতার জন্য পথ তৈরি করে দেওয়া। ফলে মানুষ ঈশ্বরের পরিবর্তে নিজেকে সব জাগতিক বিবেচনার কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে এবং সর্ববিধ অর্জনকে নিজের সন্তুষ্টির নিরিখে বিচার করার অধিকার অর্জন করেছে। এই যে বৈপ্লবিক অগ্রগতি তা কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পুরাতন আগ্রহটাকে নষ্ট করল না, বরং তাকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করে দিল। ফলে বৈষম্য যে কেবল টিকে রইল তা নয়, বৃদ্ধি পেল। যারা ক্ষমতাবান সেই অল্পসংখ্যক মানুষের ধনবৃদ্ধির সঙ্গে সমমাত্রায় বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্রে পরিণত হল এবং সম্পত্তিহীনদের ওপর সম্পত্তিবানদের শাসন ও শোষণ অধিকতর দক্ষতা অর্জন করল।
পুঁজিবাদী দর্শনের মূল ভিত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পুঁজিবাদ ইহজাগতিক; কেবল ইহজাগতিক নয়, স্থুলরূপে বস্তুতান্ত্রিক। বস্তুতান্ত্রিকতায় আকীর্ণ পুঁজিবাদীরা ধর্মকেও ব্যবহার করে থাকে। এ ব্যাপারে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। ধর্মকে কাজে লাগানো হয় বঞ্চিত মানুষকে শান্ত ও আশ্বস্ত রাখতে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষই বঞ্চিত, যত সুখ বিত্তবানদের। ন্যায়বিচারসহ সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিতদের পক্ষে বিদ্রোহ করার কথা। বিদ্রোহ যাতে না ঘটে সে জন্য ধর্মকে নিয়ে আসা হয়। পুঁজিবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত ধর্মীয় শাস্ত্র বঞ্চিত মানুষকে ইহজগতে আশ্রয় এবং পরজগতে পুরস্কারের আশ্বাস দিয়ে শান্ত রাখে। ব্যাপার আরো আছে, পুঁজিবাদের প্রকৃত শত্র“ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা; সেই ব্যবস্থার পক্ষে দার্শনিক সমর্থন যাতে গড়ে না ওঠে তার জন্য পুঁজিবাদ সর্বপ্রকারের প্রচারকার্য চালায় এবং সমাজবিপ্লবীদের সরাসরি দমন করে। ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বঞ্চিত মানুষকে তারা বঞ্চনার অবসানকামী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। এভাবে শান্ত রাখা এবং ভাগ্য পরিবর্তনের আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কাজটা যে অনৈতিক পুঁজিবাদীরা সেটা ভাবতেও চায় না। আসলে পুঁজিবাদীদের ধার্মিকতা ও নৈতিকতা পুরোপুরি মনুষ্যত্ববিরোধী। এদের বস্তুতান্ত্রিকতাও মানুষের ইহজাগতিক অগ্রগতির শত্র“পক্ষ বৈ নয়। পুঁজিবাদীরা ধার্মিক-অধার্মিকের, নাস্তিক-অনাস্তিকের ব্যবধান তৈরি করে শোষণ ব্যবস্থাকে আড়াল করে দেয়। সাম্প্রদায়িকতাও তৈরি করে। আমাদের এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসক এবং জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ, তিনপক্ষই ছিল পুঁজিবাদে দীক্ষিত; তারা নিজ নিজ স্বার্থে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইটাকে সাম্প্রদায়িক বিরোধে পরিণত করেছে এবং ১৯৪৭ সালে মানুষকে স্বাধীনতার নামে দেশভাগের মরনাত্মক ও নিষ্ঠুর উপহারটি দান করে গেছে, যার অভিশাপ থেকে এখানকার মানুষ এখনও মুক্ত হতে পারেনি।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে কেন্দ্রে রেখে আবর্তিত পুঁজিবাদী দার্শনিকতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈষয়িক মুনাফা অর্জনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। এ ব্যাপারে ধর্ম, তা সে যতই আধ্যাত্মিক হোক, পুঁজিবাদকে সাহায্য করে। ধর্মানুশীলনের মধ্য দিয়ে যে অর্জন ঘটবে বলে আশা করা হয় সেটা সামাজিক নয়, ব্যক্তিগত; পুণ্যসঞ্চয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বৃত্তের বাইরে যায় না, তার ভেতরেই থাকে। এক্ষেত্রে ধর্ম যে পুঁজিবাদবিরোধী তা নয়, বরং তার বৃদ্ধিতে সহায়ক।
মুনাফা বৃদ্ধির লালসা একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এর ফলে বিশ্বে দুই দু’টি মহাযুদ্ধ ঘটে গেছে এবং এখনো পৃথিবীর অনেকাংশে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, নির্যাতন ও শোষণ কায়েম রয়েছে। মুনাফা আসে বাণিজ্য, জবরদখল, পুঁজি বিনিয়োগ ও লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে। এক অর্থে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক তৎপরতার সবটাই অবশ্য লুণ্ঠনের ভেতর পড়ে। একই সঙ্গে এ ব্যবস্থা মানুষকে আÍকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী হতে উৎসাহ দেয়। মানুষ অসামাজিক, পরস্পরবিচ্ছিন্ন, এমনকি নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ মানুষে মানুষে বৈষম্য তৈরি করে। যদিও সে গণতন্ত্রের মহিমা প্রচারে আগ্রহী, কিন্তু চরিত্রগতভাবেই পুঁজিবাদ অগণতান্ত্রিক, কেননা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য নিশ্চিতকরণ, পুঁজিবাদ যার বিরুদ্ধে সর্বদাই দণ্ডায়মান।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন ঘটে বৈকি, কিন্তু সেটা খাড়াখাড়ি ওপরের দিকে উঠে যায়, অনেকটা পিরামিডের মতো। এই উন্নয়ন সামাজিক নদীর মতো প্রবাহিত হয় না, প্রবাহিত হলে সমাজের সব মানুষের জীবনকে সে সুখী করতে পারত। উল্টো যা ঘটে তা হল উন্নতি সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাঁধের ওপর বর করে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। যত উঠে তত সে যন্ত্রণাদায়ক হয় ভারবাহী মানুষের জন্য। এ এক আধুনিক রূপকথা। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবেই পুঁজিবাদ পুরুষতান্ত্রিক, যে জন্য তার অধীনে নারীর নিগ্রহ ও অবমূল্যায়ন অবশ্যম্ভাবী।
৩.
এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহই নেই যে, আমাদের দেশে পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং তার সংরক্ষক ও সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণীর মতাদর্শিক আধিপত্য বিরাজ করছে। এই পুঁজিবাদে প্রগতিশীলতা নেই, অন্যদিকে এতে পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিকগুলোর সবকটিই ভীষণভাবে সমুপস্থিত। উন্নতি হচ্ছে, তবে তার সঙ্গে সঙ্গে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈষম্য। পরাধীনতারকালে আমাদের মুক্তি সংগ্রামে দেশপ্রেম ছিল বড় ভরসা, এখন যে পুঁজিবাদীরা দেশ শাসন করছে তাদের দৃষ্টি দেশের দিকে নয়, পুঁজিবাদী বিশ্বের দিকে; ফলে পুঁজি, সম্পদ, মেধা সবকিছুই পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং দেশপ্রেম ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। আমরা বিদেশী পণ্যের বাজারে পরিণত হচ্ছি। উৎপাদক খাতের তুলনায় সেবা খাত প্রসারিত হচ্ছে। যে কৃষক দেশবাসীকে বাঁচিয়ে রেখেছে তারা ভূমি মালিকানা হারিয়ে পরিণত হচ্ছে খেতমজুরে। শহর গ্রামকে নিঃস্ব করছে। গ্রামে কর্মসংস্থান নেই, ভরসাহীন মানুষ শহরে ছুটছে। শহরে তারা উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না, অর্ধবেকার থাকছে, আবাস খুঁজছে বস্তিতে। বিনিয়োগ অল্প, অলস টাকা পড়ে থাকছে ব্যাংকে; ব্যাংক ডাকাতি এখন আর বাইরে থেকে নয় ভেতর থেকেই ঘটছে। মেয়েরা এগিয়েছে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বাড়েনি। যে পোশাক শিল্প নিয়ে আমাদের অত্যন্ত অধিক গর্ব, সেটা দাঁড়িয়ে আছে সস্তা শ্রমের নড়বড়ে ও বিপজ্জনক ভিত্তির ওপর। পুঁজিবাদ এখন সব দেশেই বিদ্যমান, কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাদ কতটা যে নিুমানের তার নিদর্শন যেমন পাওয়া যাবে ভূমিদস্যুতা ও নির্লজ্জ দুর্নীতিতে তেমনি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের, যাদের অধিকাংশই নারী, তাদের দুর্দশাতে।
দ্বন্দ্বের কথা বলছিলাম; যে কোনো একটা সময়ে ও স্থানে অনেক দ্বন্দ্ব থাকে, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব প্রধান হয়ে ওঠে এবং তার মীমাংসার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জগতে দ্বন্দ্ব এখন পুঁজিবাদের সঙ্গে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদ লড়বে না। তাকে মানবিক করার যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, দেশের শতকরা পঁচানব্বই জন মানুষের বিরুদ্ধেই সে থাকবে। পুঁজিবাদের বিকল্প হচ্ছে সমাজতন্ত্র। বাংলাদেশে পুঁজিবাদী তৎপরতা আগেও ছিল; ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি উভয় শাসনামলেই যারা দেশ শাসন করত মতাদর্শিকভাবে তারা পুঁজিবাদেই দীক্ষিত ছিল এবং জনগণকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুঁজিবাদের অধীনেই থাকতে হয়েছে।
মানুষ মুক্তি চেয়েছে, মুক্তির আন্দোলনে জাতীয়তাবাদীরা ছিল, সমাজতন্ত্রীরাও ছিল। জাতীয়তাবাদীরা বিদেশীদের শাসনের বিরোধিতা করেছে ঠিকই কিন্তু ওই শাসকদের মতো তাদের আকাক্সক্ষাটাও ছিল পুঁজিবাদী ধরনের। নানা ঐতিহাসিক কারণে জাতীয়তাবাদীরাই নেতৃত্বে থেকেছে। পাকিস্তানি শাসনামলে দেখা গেছে মুক্তির সংগ্রামে সমাজতন্ত্রীরাই ছিল প্রধান শক্তি, কিন্তু তারা মূল ধারায় পরিণত হতে পারেনি। নেতৃত্ব রয়ে গেছে জাতীয়তাবাদীদের হাতেই। মুক্তির সংগ্রাম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয় এবং জনগণের আকাক্সক্ষার চাপে যুদ্ধশেষে সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের ওই সাংবিধানিক স্বীকৃতি টেকেনি, যেন পালিয়ে বেঁচেছে। কারণ যে জাতীয়তাবাদীরা শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে তারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল না; আপাত দৃষ্টিতে তারা পরস্পরবিরোধী, ক্ষমতার দখল নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর বিরোধ বিদ্যমান, কিন্তু তারা সবাই যে পুঁজিবাদে দীক্ষিত সে-বিষয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। পাকিস্তান আমলে পুুঁজিবাদের বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত ছিল, বাংলাদেশ আমলে তার অগ্রগমন নিশ্চিত হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ মুক্তি পায়নি, পুরাতন ব্যবস্থা নতুন নামে ও নববিক্রমে ফেরত এসেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয়েই ইহজাগতিক, কিন্তু পুঁজিবাদ যেমন বস্তুতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র তেমন নয়। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে পুঁজিবাদ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে আস্থার বেলায় সে একেবারেই অটল। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে এই শিক্ষা নিতে হয়েছে যে, স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়েই তাকে আন্তর্জাতিক হতে হবে। ছিন্নমূল আন্তর্জাতিকতা ও গ্রাম্য স্থানীয়ত্ব দুটোই একপেশে এবং অকার্যকর।
আমাদের দেশে পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিটি সুপ্রতিষ্ঠিত। শিক্ষাব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। এ ঘোষণা অটুট রয়েছে যে, শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষ সৃষ্টি করা। শিক্ষার্থীদের বলা তুমি বড় হও; যার অর্থ তুমি নিজে উন্নতি কর, আত্মকেন্দ্রিক হও, অন্যের কথা ভেবো না। এই আদর্শটি পুঁজিবাদী বৈকি। শিক্ষাক্ষেত্রে যে তিনটি সুস্পষ্ট ধারা বিদ্যমান, তারা শ্রেণী বিভক্তির কারণে সৃষ্ট এবং শ্রেণী দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল; কিন্তু তিন ধারা অভিন্ন তাদের লক্ষ্যের ব্যাপারে; লক্ষ্য হল সামাজিক মানুষের পরিবর্তে পুঁজিবাদী মানুষ তৈরি করা।
ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার ভেতর যোজন যোজন দূরত্ব, দু’য়ের ভেতর মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত অসম্ভব; কিন্তু দুয়ে মিলে একটা কাজ খুব ভালোভাবে করে যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জনবিচ্ছিন্ন করা। ইংরেজি মাধ্যমের বেলাতে কাজটা বেশ পরিষ্কার; মাদ্রাসা শিক্ষাও যে ওই একই কর্তব্যে নিয়োজিত সেটা কিছুটা অস্পষ্ট হলেও সত্য। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা নিজেদের শিক্ষিত, কেবল শিক্ষিত নয় পবিত্র শিক্ষায় শিক্ষিত বলে মনে করে। ফলে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের অহমিকা জšে§; তারা উৎপাদনের কাজে হাত লাগাতে উৎসাহ বোধ করে না। তা ছাড়া কাজের দক্ষতাও তারা অর্জন করে না। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই গরিব ঘরের সন্তান, শিক্ষা তাদের জন্য দারিদ্র্য মোচনের সহায়ক না হয়ে বরঞ্চ তাদেরকে বেকার জীবনের দুর্বিষহতার দিকে ঠেলে দেয়। শিক্ষাদানের নাম করে তাদেরকে দারিদ্র্যের বৃত্তে আটকে রাখার জন্য এ এক নির্মম পরিহাস ও ষড়যন্ত্র। এই শিক্ষার ব্যাপারে শাসকশ্রেণীর সব মহল, কি সরকারি কি বেসরকারি, সমানভাবে উৎসাহী। পেছনের কারণ গরিব মানুষকে সন্তুষ্ট রাখা, নিজেদের জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন এবং সেই সঙ্গে পরকালের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করা।
পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য এখন পাবলিকের সব জিনিস প্রাইভেট হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র পাবলিক রেলওয়ের উৎসাহ দেখায় না, পারলে তাকে বেসরকারি করে দেয়; রাষ্ট্রের উৎসাহ সবদিক দিয়েই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক প্রাইভেট বাস সার্ভিসে। রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানার প্রসার নেই, কিছু কিছু বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক চলে গেছে ব্যক্তি মালিকানায়। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রায় সবটাই এখন প্রাইভেটের দখলে। সরকারি ব্যাংককে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে দিয়ে রমরমা ব্যবসা চলছে প্রাইভেট ব্যাংকের। বলা হচ্ছে এবং প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে যে, পাবলিকের নিজের যেমন ভালো বলতে প্রায় কিছুই নেই, পাবলিক ব্যবস্থাপনাও তেমনি পুরোমাত্রায় অভিশপ্ত; সে দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনুপযোগী। আর প্রাইভেট মানেই হল দক্ষ, উৎপাদনশীল এবং চূড়ান্ত বিবেচনায় পবিত্র।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো টিকে আছে, তবে সেখানেও যে ধরনের বিশৃংখলা ও দলাদলি বিদ্যমান তা কোনো শুভ সংবাদ বহন করে না- না প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য, না দেশের জন্য। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় আসন সংখ্যা এতই অল্প যে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটতে হয়। সেখানে পড়তে গেলে খরচ অনেক। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিঃসন্দেহ নয়, তবু যেতে হয় এবং খরচ জোগাতে নিরুপায় অভিভাবককে অনেক সময়ে জমিজমাও বিক্রি করতে হয়ে বলে জানা যায়।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীকারটা বেশ পরিচ্ছন্ন। সেটা হল পুঁজিবাদী মানুষ তৈরি করা। সেখানে সেসব বিদ্যারই শুধু চল রয়েছে যেগুলো জীবিকার জন্য উপযোগী; দর্শন, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান উপেক্ষিত। দর্শন অধ্যয়নের জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ আছে এমন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর জানা যায় না, বাংলা সাহিত্যের চর্চার ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীরা চটপটে ও কর্মকুশলী হোক, তারা অনেক খবর রাখুক, চাকরির জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠুক, এমনটাই চাওয়া হচ্ছে; তারা চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল ও সামাজিক হোক এমন লক্ষ্যকে দূরে সরিয়ে রাখে। তথ্যসমৃৃদ্ধ মানুষ আর জ্ঞানী মানুষ এক নয়। তথ্য যখন জ্ঞানে পরিণত হয় তখন আশা থাকে যে তা প্রজ্ঞার জন্ম দেবে। জ্ঞান গভীর হওয়ার এবং প্রজ্ঞার পথে এগুনোর সুযোগ পায় যদি মাতৃভাষার মাধ্যমে তার অনুশীলন ঘটে। সেটা ঘটছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান অকল্পনীয়।
বাংলা ভাষার প্রশ্নটি এখানে প্রাসঙ্গিক। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল তা মধ্যবিত্তরাই শুরু করেছিল, কিন্তু তা সফল হয়েছে জনগণের অংশগ্রহণের কারণে। পেছনে তাকিয়ে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, এ ব্যাপারে মধ্যবিত্তের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাধরণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য ছিল। তার কারণ মাধ্যবিত্তের সামনে একটা বিকল্প ছিল, সাধারণ মানুষের কাছে সেটা ছিল না। মধ্যবিত্তরা ইংরেজির চর্চা করেছে, ইংরেজিতে অভ্যস্তও হয়ে উঠেছে, সাধারণ মানুষ ইংরেজি জানত না, মাতৃভাষাই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। মধ্যবিত্তের অবস্থান ছিল উর্দুর বিরুদ্ধে; সাধারণ মানুষের অবস্থান উর্দু ও ইংরেজির উভয়ের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানিরা যদি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা না করত তাহলে মধ্যবিত্ত হয়তো অতটা উদ্বিগ্ন হতো না; ইংরেজি চালু ছিল, সেটাকে তারা মেনে নিতে ভীষণভাবে আপত্তি জানাত না। এই অনুমান সমির্থত হয় যখন দেখি বাংলা রাষ্ট্র ভাষা হওয়ার পরে মধ্যবিত্তের যে অংশ উপরে উঠে গেছে সেটি বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রতি অধিক আকর্ষণ বোধ করে। রহস্যটা এখানে যে, তারা পুঁজিবাদকে মেনে নিয়েই জীবনযাপন করছিল; ইংরেজি পুঁজিবাদের ভাষা, তাই সেটিকে গ্রহণ করতে তাদের আপত্তি নেই। পুঁজিবাদ মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞানের চর্চার পথে অন্তরায় হয়ে রয়েছে; জ্ঞানের অন্বেষণ এবং জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় পরিণত করার ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত না করে বরঞ্চ নিরুৎসাহিত করছে।
বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও অনুশীলনের জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের ক্লাব আছে; কিন্তু যা নেই তা হল ছাত্র সংসদ। ছাত্র সংসদ থাকলে রাজনীতি এসে যাবে এমন আশঙ্কা। রাজনীতি বলতে এক্ষেত্রে দলাদলি বোঝানো হয়। রাজনীতির যে একটি দার্শনিক দিক রয়েছে সেটা খেয়াল করা হয় না; এটাও মান্য করা হয় না যে, রাষ্ট্র যেহেতু আছে তাই রাজনীতি থাকবেই এবং রাজনীতিতে যদি মেধাবানরা না আসে তাহলে ব্যবসায়ীরা আসবে, বাংলাদেশে এখন যেমনটা দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের যদি সামাজিক ও সৃষ্টিশীল করতে হয় তবে ছাত্র সংসদ থাকা অত্যাবশ্যক। শিল্পকারখানার ট্রেড ইউনিয়ন যতটা জরুরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের আবশ্যকতা তার চেয়ে কম নয়। কেননা ছাত্র সংসদ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য মিলবার, মিশবার, আদান-প্রদানের জায়গা; সেখানে তারা সাহিত্যচর্চা, নাটক, গান, আবৃত্তি, বিতর্কসহ সব ধরনের সাংস্কৃতিক কাজের সুযোগ পাবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের মেধাকে বিকশিত করবে, তাদের ভেতর পারস্পরিক আদান-প্রদান ঘটবে, তারা সৃষ্টিশীল ও সামাজিক হয়ে উঠবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নামে আছে, কিন্তু কাজে নেই। সেখানে বছরের পর বছর কোনো নির্বাচন হয় না। কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। বোঝা যায় রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ বিকাশে উৎসাহী নয়, রাষ্ট্র চায় খণ্ডিত, খর্ব ও অনুগত মানুষ; চিন্তাশীল মানুষ তার জন্য উপযোগী নয়। এটি একটি দৃষ্টান্ত মাত্র, এমন বহু দৃষ্টান্ত সমাজের সর্বত্র পাওয়া যাবে।
মানুষের জন্য বিনোদন অত্যাবশ্যক। সেখানে বাণিজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। টেলিভিশন ও রেডিওতে যে বিনোদন সরবরাহ করা হয় সেটা পণ্যের বিজ্ঞাপনের স্বার্থে। বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে গান, নাটক, নৃত্য আলোচনা চলে। পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারটাই লক্ষ্য, বাকিটা অজুহাত। দেখা যাচ্ছে যে, বিনোদন ক্রমাগত ঘরোয়া ও ব্যক্তিগত হয়ে পড়েছে, সামাজিক থাকছে না। কারণ পুঁজিবাদ সমাজকে চেনে না, ব্যক্তিকে চেনে।
বিনোদনকে অবলম্বন করে হিন্দি ভাষা এখন মানুষের ঘরে ঘরে। উর্দুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল, হিন্দির বিরুদ্ধে নেই, কেননা হিন্দি বলপ্রয়োগ করছে না, আনন্দদানের ছদ্মবেশে ঘরের ভেতর অনুপ্রবেশ করছে এবং একটি সাংস্কৃতিক উপনিবেশ গড়ে তোলার অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। পণ্যের বিজ্ঞাপন-বাণিজ্য কেমন সর্বগ্রাসী হয়ে পড়েছে তা আমাদের সংবাদপত্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। সংবাদপত্রে সংবাদের চেয়ে বিজ্ঞাপনের মর্যাদা প্রাপ্তি একটা পুরাতন সত্য; কিন্তু অধুনা দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে জরুরি যে দুটি পাতা- প্রথমটি ও শেষেরটি- তারাও তলিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের প্লাবনে। মালিকের তাতে আনন্দ, পাঠকের জন্য বঞ্চনা।
৪. পুঁজিবাদ এখন কেবল রাষ্ট্রের ও সমাজের নয়, ব্যক্তিরও আদর্শ। সে স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। পুঁজিবাদীরা মাদকের ব্যবসা করে, এর দার্শনিক আদর্শটাও এক ধরনের মাদক, যাকে নানাভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে বিনামূল্যে, কিন্তু মূল্য দিতে হচ্ছে মনুষ্যত্বকে। সব কিছু মিলিয়ে আধুনিক বিশ্ব একটি বাজারে পরিণত হয়েছে এবং সেই আদিম আরণ্যক নীতি প্রতিষ্ঠিত যে সে-ই শুধু টিকবে যার শক্তি আছে।
পুঁজিবাদের সঙ্গে মনুষ্যত্বের যে দ্বন্দ্ব তার মীমাংসা তাই অত্যাবশ্যক। জ্ঞানই শক্তি, এই সত্য মিথ্যা হয়ে যায়নি, যদিও টাকার জোর সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওই জ্ঞান যদি ভাববাদী হয় তা হলে বস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষতি হয় না, উল্টো লাভই হবে; প্রকৃত জ্ঞান বৈজ্ঞানিক, অর্থাৎ ইহজাগতিক। কিন্তু কেবল জ্ঞানে তো কাজ হবে না, জ্ঞানের প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রয়োগটা প্রথমত ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ঘটবে, কিন্তু তার লক্ষ্য থাকবে সামাজিক। ঐক্যেই শক্তি, বিচ্ছিন্নতাতে হতাশা, এটাও সত্য বটে। ঐক্যবদ্ধ না হলে মানুষের অগ্রগতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক পুঁজিবাদকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। জীবন ও জগতে অসংখ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে, কিন্তু অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের সঙ্গেই আজ মানুষের প্রধান দ্বন্দ্ব, ওই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হলে সঙ্গে সঙ্গে যে অন্যসব দ্বন্দ্বের অন্তর্ধান ঘটবে এমনটা অবশ্যই নয়, কিন্তু ওটির মীমাংসা ভিন্ন অন্য দ্বন্দ্বগুলো অনড়ই রয়ে যাবে, এখন যেমন আছে। এই তথ্যটি মনে হয় সত্য। দার্শনিক অতৃপ্তি মানুষের মস্তবড় গুণ, সেই অতৃপ্তির প্রবাহ পথে প্রধান প্রতিবন্ধকের অপসারণ করা মানুষেরই কর্তব্য, মনুষ্যত্বকে অক্ষুণ্ন রাখার আবশ্যকতায়।

 

যুগান্তর;প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ফিচার

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*