শিরোনাম

শিক্ষা ও সুশিক্ষা

244338_127শিক্ষা হচ্ছে মানুষের সাধারণ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আত্মবিকাশের একটি ধারাবাহিক দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি। শিক্ষা একটি বিশেষ দর্শন। শিক্ষা হলো আগুনের পরশমণি, যার ছোঁয়ায় মানুষ পাল্টে যায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের গভীর জীবনবোধ, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। অন্য কথায় শিক্ষা মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জাগরণ সৃষ্টি করে। শিক্ষা পারিবারিক অনুশাসন, আদর্শিক মূল্যবোধ ও সুস্থ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। শিক্ষা হলো কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া। তাই শিক্ষা সাধারণত বিষয়মুখী।

শিক্ষা বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। উন্নত সমাজ গঠন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা জাতির জন্য বড় শক্তি। সাধারণ থেকে কিভাবে অসাধারণ হওয়া যায় তার প্রমাণ শিক্ষা। তবে সুশিক্ষাই জাতির জন্য বড় শক্তি। সুশিক্ষা জীবনের দুঃসময়ে প্রাণের পরশ জাগায়। সামাজিক উৎপাদনের লক্ষ্যে সঙ্ঘবদ্ধ ও অবিচ্ছিন্ন শ্রমের মাধ্যমে যুগযুগ ধরে যে মূল্যবান মানবিক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে থাকে, তাকেই সুশিক্ষা বলে।

দেশকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে হলে সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সুশিক্ষায় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকতে হবে। সুশিক্ষার মাধ্যমে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও উদারতা শেখার সংস্কৃতি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। পাশ্চত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন প্রতিহত করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। সুশিক্ষা মানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়। সুশিক্ষা আসলে মানুষকে দক্ষ করে এবং অনুকূল অথবা প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার শক্তি জোগায়। তার ভেতরের সৃজনশীলতা ও গুণাগুণ বাড়িয়ে দেয়। তার সব সম্ভাবনাময় দিগন্ত উন্মোচিত করে। সুশিক্ষিত মানুষ মাত্রই স্বশিক্ষিত।

শিক্ষা সম্পর্কে বিজ্ঞজনেরা বলেন, যে শিক্ষা একটি শিশুর মন ও আত্মার সমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করে সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। শুধু সাক্ষরতা শিক্ষা নয়। বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত চিন্তানায়ক, দার্শনিক মহামতি সক্রেটিস শিক্ষাকে আরো সরলভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার মতে, ‘শিক্ষা একজন ব্যক্তির মধ্যে নিহত থাকা যুক্তিসিদ্ধ ভাবধারাগুলোর যথার্থ বিকাশ নিশ্চিত করে।’।

আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে মহামতি সক্রেটিস বলেছেন- Know thyself যে নিজেকে চিনতে পেরেছে তার কাছেই শিক্ষা ও জ্ঞানের দরজা খুলে গেছে। সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করাও মানুষের শিক্ষার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না। সমাজ, দেশ ও জাতিকে কিছু দেয়ার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। শিক্ষা জীবনকে সুপথে সুকাজে এগিয়ে নিয়ে যায়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভালো ফল করাও নয়। অনেকে ভালো ফল করেও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

পক্ষান্তরে ভালো ফল না করেও অনেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরীক্ষায় ভালো, আরো ভালো করা এটা বিশ্বাস। বিশ্বাস বা আত্মবিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হওয়া যায় না। শিক্ষা জ্ঞানের স্বর্ণদুয়ার খুলে দেয়। যে স্বর্ণদুয়ার দিয়ে প্রবেশ করলে মানুষ তার যুগসঞ্চিত জঞ্জাল দূর করে জ্ঞানী, প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও প্রতিশ্রুতিশীল হয়। শিক্ষা আলোকিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। শিক্ষা দীপ্তিময় জীবনের স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার। জীবনের প্রতিটি সূর্যোদয় শিক্ষার সূচনা আর প্রতিটি সূর্যাস্ত শিক্ষারই বর্ণনা। স্বপ্নিল ক্যারিয়ার গড়তে বাস্তবমুখী শিক্ষার দরকার। শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে শিক্ষা হলো চাঁদ আর সংস্কৃতি জোছনা। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর সংস্কৃতি সমাজের মেরুদণ্ড। উল্লেখ্য, একটি সৎ, শিক্ষিত, দক্ষ ও উন্নত জাতি রাতারাতি ভুঁইফোড়ের মতো বের হয় না।

যুগ-যুগান্তরের সাধনায় তা সৃষ্টি হয়। প্রয়োজন দেশের মানুষকে যুগোপযোগী শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। শিক্ষা ছাড়া একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে সঠিক ও সাম্যকভাবে জ্ঞান লাভ করতে পারে না।
শিক্ষা সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, আবেগ-আনন্দসহ বিভিন্ন বাস্তবধর্মী অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বর্তমান বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল শিক্ষার অভাবে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা মেধার লালন ও চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে অনুপ্রাণিত ও গতিশীল করতে না পারলে মানুষ ও সমাজের পরিবর্তন আসবে না। আর সুশিক্ষা ছাড়া মানুষের সুন্দর ও নৈতিক চরিত্র গঠন আদৌ সম্ভব নয়। সুশিক্ষা জীবনের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরায়। সুশিক্ষাই সুনাগরিক তৈরি করে।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি কলেজ,
কলারোয়া, সাতক্ষীরা

Be Sociable, Share!
বিভাগ: পড়া-লেখা

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*