শিরোনাম

কোন্দলে ২৮ মাসেও পূর্ণ হয়নি ঢাবি ছাত্রলীগের কমিটি

268007_18নিজস্ব প্রতিবেদক: ফের সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। সম্প্রতি শাখা সভাপতি আবিদ আল হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগে গত জুলাইতে একই নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয় ঢাবি ছাত্রলীগ। বিজ্ঞপ্তিতে এক মাসের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ থাকলেও সাড়ে ছয়মাসে এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি কমিটি। ছাত্রলীগের একটি বড় অংশের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলের কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া সম্ভব হয়নি।
২০১৫ সালের ১৮ জুন আবিদ আল হাসানকে সভাপতি ও মোতাহার হোসেন প্রিন্সকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে একবছরের জন্য ঢাবি ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একবছরের জন্য গঠিত এ কমিটি বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছে প্রায় সোয়া দুই বছর (২৮ মাস)। এ দীর্ঘ সময়েও পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি। এর আগে হাসান-প্রিন্সের দায়িত্বগ্রহণের প্রায় ১৮ মাস পর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ১৮টি হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে ছাত্রলীগ। এর পর কেটেছে আরো ১০ মাস।
আগেও এক মাসের বেধে দেয়া সময়েও কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাইয়ে সেই বিজ্ঞপ্তি দেয়া পর্যন্ত ২৫ মাস দায়িত্বে থেকে মাত্র ছয় হলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয় ঢাবি ছাত্রলীগ। তারপরে গত সাড়ে ছয় মাস পার হলেও হয়েছে মাত্র ৪ হলের কমিটি। প্রায় ২৮ মাসের দীর্ঘ দায়িত্বে থেকেও মাত্র ১০ হলে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে সক্ষম হয় তারা। আরো বাকি রয়েছে আট হল।
ইতোমধ্যে ১৮টি হলের মধ্যে ছেলেদের পাঁচটি এবং মেয়েদের পাঁচটি (সবক’টি) হলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়েছে। কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা ছেলেদের হলগুলো হলো- মাস্টার দা’ সূর্যসেন, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান, হাজী মুহম্মদ মুহসীন, ফজলুল হক মুসলিম হল এবং অমর একুশে হল। মেয়েদের হলগুলো হলো- বেগম রোকেয়া, শামসুন নাহার, বাংলাদেশ-কুয়েত-মৈত্রী, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজব এবং কবি সুফিয়া কামাল হল। তবে এখনো বাকি থাকা আটটি হল হলো- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, পল্লীকবি জসীমউদদীন, বিজয় একাত্তর, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক, সলিমুল্লাহ মুসলিম, স্যার এফ রহমান, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং জগন্নাথ হল। এ ছাড়াও ছাত্রলীগের নতুন চালু হওয়া ইউনিটের মধ্যে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদেরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সকল হল, অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাবি শাখা ছাত্রলীগ। নির্দেশ অনুযায়ী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে ঢাবি ছাত্রলীগের সকল আবাসিক হল, অনুষদ ও ইন্সটিটিউটের কমিট পূর্ণাঙ্গ করা করতে হবে। তবে প্রায় এক সপ্তাহের সময়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য ছাত্রলীগের হল নেতাদের অনেকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি হলের সাধারণ সম্পাক বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে তালিকা যাচাই-বাছই সম্ভব হবে না। তাই এ সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেও কমিটি দেয়া সম্ভব হবে না।
অভিযোগ আছে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলের জেরেই দীর্ঘ ২৮ মাসেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ শাখাটি। এর মধ্যে কয়েক দফায় ১০টিতে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারলেও আটকে আছে বাকি আট হলের কমিটি। গত বছরের ডিসেম্বরে হলগুলোতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা নিয়েও অন্তকোন্দলের জেরে কমিটি দিতে কালক্ষেপণ করে ঢাবি ছাত্রলীগ। সম্মেলনের পরপর কমিটি দেয়ার কথা থাকলেও একে একে চলে যায় ১৫ দিন। পরে সাবেক প্রভাবশালী নেতার হস্তক্ষেপে আপোষ মীমাংসা করে কমিটি দেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয়-বিশবিদ্যালয়ের দ্বন্দ্ব এ দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ। কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সের মধ্যে দীর্ঘদিনের কোন্দল। দ ‘জনে একই প্যানেলে রাজনীতি করলেও বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলের প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে গত আগস্টের ঘটনায় প্রিন্সের গ্রুপ ছেড়ে সোহাগের সাথে রাজনীতি করায় ২ আগস্টের শাখার ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক ইমাম সুলতানা স্মৃতিকে মারধর করেন প্রিন্সের অনুসারীরা। এছাড়াও অন্তকোন্দলের জেরেই মারধর ও যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয় ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সিটিটিউটের সভাপতি বোরহান উদ্দীনের বিরুদ্ধে।
এদিকে যতগুলো হলে কমিটি হয়েছে এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের অনুসারী প্যানেলের ছেলেদের কোনো (মেয়েদের দুটি বাদে) হলেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়নি। কমিটি পূর্ণ না করার পিছনে ক্ষমতা কুক্ষীগতের কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে ছাত্রলীগের একটি সূত্র। কমিটি দিয়ে দিলে যদি নেতাকর্মীরা আগের মতো কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ না করার, গ্রুপিং ও বড় ধরনের সংঘাতের ভয়। দেখা গেছে যে হলগুলোতে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে সে হল থেকে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ পূর্বের তুলনায় কমেছে। এভাবে যেন আর কমে না যায়। এছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোট-বড় হলগুলোতে সমান সংখ্যক সদস্যের কমিটি করা নিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। সেখানে কমিটি দিলে অসন্তোষে পড়ার আশঙ্কায় কয়েকটি হলের কমিটি হচ্ছে না বলে জানান হল সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা।
ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, বিভিন্ন হলে অর্ধ্বশতাধিক নেতাকর্মীর ওপর আরোপিত বহিষ্কারাদেশ এখনো তুলে নেয়া হয়নি। বিশবিদ্যালয়ের বিভিন্ন ঘটনায় বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ কর্মীদের সংগঠনে ভিড়াতেই এ কালক্ষেপণ হচ্ছে। এছাড়া একাধিক হলের কমিটি চূড়ান্ত করা হলেও বহিষ্কৃতদের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার অপেক্ষায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কমিটি দেয়া সম্ভব হয়নি। একটি অংশের অভিযোগ, যেকোনো কমিটিতে থাকে সাবেক-সিনিয়রদের হস্তক্ষেপ এবং সুপারিশ। এদের মধ্য থেকে সিদ্ধান্তগ্রহণ করা নিয়েও দ্বিধায় পড়তে হয় হলের সভপতি-সাধারণ সম্পাদকদের। সুপারিশ রাখা না রাখা নিয়েও তাদের মধ্যে চলে যুদ্ধ।
উল্লিখিত বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ।
সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, ১৭ নভেম্বরের মধ্যে কমিটি দেয়াটা ঢাবি ছাত্রলীগের কোনো নির্দেশ না, কেন্দ্রের নির্দেশ। আমরা বলেছি যতদ্রুত সম্ভব কমিটি দেয়ার জন্য। এর আগে দীর্ঘ সময়েও যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজন্যই তো কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে বলা হয়েছে। হল, অনুষদসহ সবগুলোর কমিটির পরে তারা সম্মেলন দিবে।
কমিটির সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, আগেও নির্দেশ দেয়া হলেও তখনকার পরিস্থিতিতে ছাড় দেয়ার কারণে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। তবে এবার আমরা খুব শক্তভাবে নির্দেশ দিয়েছি। এতো কম সময়ের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব কবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবনবৃত্তান্ত আগেই নেয়া হয়েছে। এখন শুধু কমিটি যাচাই-বাচাই করে ঘোষণা করতে হবে। অন্তকোন্দলের বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাবি ছাত্রলীগে কখনোই অন্তকোন্দল ছিল না, এখনো নেই। দীর্ঘসূত্রিতার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কাজ এগোচ্ছে।
সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, এর আগে দেয়া বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে বাধ্যবাধকতা ছিলো না। বহিষ্কৃতদের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে তারা কমিটিতে আসার সুযোগ নেই। তবে যাদের বহিষ্কারাদেশ উঠবে তারা আসতে পারে। বিশবিদ্যালয় ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্বের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী একযোগে কাজ করে যাচ্ছি।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: জাতীয় খবর, প্রধান খবর - ২

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*