শিরোনাম

সাত বছর পর নোয়াখালীতে বোরো ধান সংগ্রহ!

2015_09_16_08_41_42_f7fKpSrm5ifyHo9QdG7yaPk6y4bvj7_originalজেলা সংবাদদাতা: প্রায় সাত বছর বন্ধ থাকার পর নোয়াখালী থেকে এবার বোরো ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। এ বছর সরকারিভাবে জেলার ৯টি উপজেলা থেকে ৮ হাজার ৯৯৭ টন বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের মাধ্যমে খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের কাছে ধান সংগ্রহের নির্দেশনামাও পৌঁছে গেছে। শুরু হয়ে গেছে নানা প্রচারণা, কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের নামের তালিকা খাদ্য গুদামে প্রেরণের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ হয়েছে।

নোয়াখালী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ৫ তারিখ অধিদপ্তর থেকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে বোরো ধান সংগ্রহের পরিপত্র এসে পৌঁছে। পরিপত্র আসার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে নির্দেশনামা প্রেরণ করা হয়। ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ধান-চাল সংগ্রহ কমিটির বৈঠক শেষে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। খাদ্য গুদামগুলোতে লাল সালু টানানো হয়েছে। এ বছর অধিদপ্তরের নির্দেশ মোতাবেক জেলা থেকে ৮ হাজার ৯৯৭ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

এর মধ্যে সদর উপজেলা থেকে ১০২১, সুবর্ণচর থেকে ২৩৮, হাতিয়া থেকে ০৩, কোম্পানীগঞ্জ থেকে ১৫৫, কবিরহাট থেকে ৯০০, সেনবাগ থেকে ১৩৪৬, বেগমগঞ্জ থেকে ২৪৪৪, চাটখিল থেকে ১২৭৪ ও সোনাইমুড়ী উপজেলা থেকে ১৬১৬ টন বোরো ধান সংগ্রহ করা হবে। সরকারিভাবে প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২০ টাকা। এ সংগ্রহ অভিযান চলবে আগস্ট মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত। ধান সংগ্রহ শেষে তা স্ব স্ব উপজেলার গুদামজাত করা হবে। পরবর্তীতে তা সময় মতো মিলারদের মাধ্যমে ক্র্যাশ করা হবে। নোয়াখালীতে প্রায় ৭ বছর পর আবার বোরো ধান সংগ্রহ হচ্ছে বলেও সূত্র জানায়।

২০০৯ সালে সর্বশেষ নোয়াখালী থেকে বোরো ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর বিগত সময়গুলোতে শুধু চাল সংগ্রহে সীমাবদ্ধ ছিল কার্যালয়টি। ধান সংগ্রহের পর নানা বিপাকে পড়তে হয় খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের। ফলে জামেলা এড়াতে ধান সংগ্রহে অনিহা প্রকাশ করে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বেঁধে দেয়া নিয়মে ধান ক্রয় ঝটিল হয়ে পড়ে। টাটকা শুকনো, চিটাবিহীন ধান কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। আবার কেনার পরও বিপাকে পড়তে হয়। ধান কেনার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্র্যাশ করার সুযোগ না থাকায় এক থেকে দুই-তিন মাস পর্যন্ত গুদামজাত করতে হয়। কোনো কোনো সময় তা এক বছরও গুদামে পড়ে থাকে। এতে করে গুদামজাত ধান শুকিয়ে প্রতি মণ থেকে ওজনে ২-৩ কেজি পরিমাণ কমে যায়। আবার দেখা যায় ধানগুলোতে কৈতরি পোকা, লেদা পোকার আক্রমণ। এছাড়া ইঁদুরে কাটতে শুরু করে।

এমন ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার গুদাম কর্মকর্তাদেরই বহন করতে হয়। ফলে তারা এ ঝটিলতার ফাঁদে পড়ার ভয়ে ধান সংগ্রহ থেকে বিরত থাকার বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। এছাড়াও রাজনৈতিক, ফড়িয়াদের প্রভাব ও বিভিন্ন স্থানে ঘুষ দেয়ার প্রবণতা তো থাকেই। ধান সংগ্রহের নীতিমালায় সংস্কার করে সংগ্রহকৃত ধান দ্রুত ক্র্যাশ করার ব্যবস্থা করলে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান কর্মকর্তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর নোয়াখালীর ৯টি উপজেলায় ৫৬ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার ৮ হেক্টর ও উফশী আবাদ হয়েছে ১৯ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে। সে হিসেবে বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯২ টন।

বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে নোয়াখালী অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। পুরো এপ্রিল পর্যন্ত চলে ধান কাটার ধুম। প্রকৃত কৃষকরা ক্ষেতে ধান রেখেই তা বিক্রি করে দেয়। ফলে তখন নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় তারা। বেশিরভাগ কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারে না। মহাজন, এনজিও ও ব্যাংকের ঋণের কথা চিন্তা করে সামান্য মূল্যে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করে কৃষকরা।

প্রথম দিকে প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায়। বর্তমানে বাজারে বোরো ধানের মূল্য ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা। যদিও সরকারিভাবে প্রতিমণ ধান ক্রয় হচ্ছে ৯২০ টাকায়।

নোয়াখালী জেলা কৃষক ফ্রন্টের সভাপতি তারকেশ্বর দেবনাথ জানান, প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের প্রায় ৮০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এবছর বাজারে সর্বশেষ বর্তমানে মূল্য সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। সরকারিভাবে যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রকৃত অর্থে তাও কম। তারপরও যে দাম নির্ধারণ করেছে তাও তো কৃষক পাচ্ছে না। সরকারিভাবে বিভিন্ন বাজারে ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা ছাড়া প্রকৃত কৃষক সরকারি নির্ধারিত মূল্য পাবে না। তাছাড়া গুদামগুলোকেও আধুনিক করতে হবে। রাজনৈতিক ও ফড়িয়াদের প্রভাবমুক্ত করার দায়িত্বও সরকারের।

কবিরহাট উপজেলার নরোত্তমপুর গ্রামের কৃষক সৈয়দ আহাম্মদ বলেন, ‘যখন কৃষকের দরকার তখন সরকার ধান ক্রয় করে না। কৃষক ধান বিক্রি করে দিলে তখন সরকার ধান ক্রয় করে। তখন সরকার ধান ক্রয় করে তাদের চিহ্নিত কিছু পাইকার থেকে। এতে করে কৃষক সরকারি নির্ধারিত মূল্য পায় না।’ তিনি মৌসুমের শুরুতে যেন সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু করা হয় তার দাবি করেন।

দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অধিদপ্তর কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তালিকা মোতাবেক প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে যেন ধান সংগ্রহ করা যায় সে জন্য রাজনৈতিক ও পাইকারদের প্রভাব এড়িয়ে চলতে এ বছর কৃষি বিভাগের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ধান সংগ্রহে সরকারি কিছু কঠর নির্দেশনা মানতে হয়। কিন্তু দেখা গেছে কৃষকরা ক্ষেতে রেখেই ধান পাইকারদের কাছে অল্প মূল্যে বিক্রি করে দেয়। এতে করে কৃষকরাই লোকসানে পড়ে। কিছুদিন অপেক্ষা করলে কৃষকরা ভালো মূল্য পেতে পারে। যদি বাহির থেকে ধান ক্রয় করা হয় তখন হয়তো গুদামে ধান থেকে যায়। তবে বেশিরভাগ সময় ধান দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্র্যাশ করা হয়।’

Be Sociable, Share!
বিভাগ: কৃষি খবর, প্রধান খবর - ১

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*