শিরোনাম

মরা কার্তিক গত হয়েছে ; ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি

ডেস্ক রিপোর্ট: আজ মঙ্গলবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। নতুন মাসের প্রথম দিন উদযাপিত হবে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রধান উৎসবে মাতবে গ্রামবাংলা। নতুন চালে হবে নবান্ন। ঘরে ঘরে চলবে পিঠাপুলির আয়োজন।“ঠাঁই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়াছে ভরি”। কিংবা ‘চার দিকে ন্যুয়ে পড়েছে ফসল / তাদের স্তন থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল / প্রচুর শষ্যের গন্ধ থেকে থেকে আসিতেছে ভেসে / পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রানে ভরা আমাদের ভরারের দেশে’। প্রকৃতিপ্রেমী কবিদের চোখে এভাবেই ফুটে উঠেছে সোনালী ধানের রূপ-সৌন্দর্য আর বাঙ্গালি সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গ ‘নবান্ন’। হেমবরণী হেমন্তে মাঠ ভরা সোনালী ধানের মিষ্টি গন্ধ বুক ভরিয়ে দেয় সকলের। পল্লীর নিস্তরঙ্গ জীবনে আসে প্রাণের আভাস। কৃষকদের মুখে প্রাপ্তির উজ্জ্বল্য; বুকে বাধভাঙ্গা আনন্দ। অভাব ক্লিষ্ট গ্রামে আসে স্বস্তির আশ্বাস। নারকেল, লেবু, কমলার মতো সুস্বাদু ফল, হরেক রকম টাটকা সাক সবজিসহ নবান্নের ডালি নিয়ে হেমন্ত আসে বাংলার ঋতু বৈচিত্রে। হেমন্তের অহংকারী আমেজ নবান্নের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে দেয় সকলের নাকে।  আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। সকালের স্নিগ্ধ রোদে মাঠ ঘাট উজ্জ্বল হয়ে উঠে। নবান্ন বছরে একবার আসে কিন্তু নবান্নের গান চলে বছর জুড়ে।

প্রতিটি সকালে বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে উচ্চারিত হয়- ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি…।  কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত গ্রাম-প্রান্তর, দিনে গরম রাতে শীত, সূর্যের ভালোবাসায় পল্লবিত প্রকৃতি, দুর্বা ঘাস আর ফুলের পাপড়িতে শিশির বিন্দু, পতাঝড়া বৃক্ষের নৃত্য, মাঠে সোনা রং ধানের শীষ, পরিপাটি  উঠানে আঁটি আঁটি ধানের স্তুপ, গোলা ভরা ধান, গাছিদের বাঁকে সুমিষ্ট খেজুরের রস, ঘরে ঘরে মুড়ি-মুড়কি, আতপ চালের ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠার ধুম, বাড়ি বাড়ি নবান্নের উৎসব।  চিরায়ত বাংলার অগ্রহায়ণের চিরচেনা রূপ এটি। ‘আমন’ ধান কাটা, মাড়াই, বাছাই ও শুকানোর জন্য ‘খলা’ তৈরীতে ব্যস্ত এখন জকিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যান্ত অঞ্চলের কিষাণ-কিষাণী। কিছুদিনে মধ্যেই ধান চাল বিক্রি নিয়েও শুরু হয়ে যাবে দৌঁড়ঝাপ। নবান্নে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয় শ্বশুরালয়ে। মেয়েকেও ‘নাইওর’ আনা হয় বাবার বাড়ীতে। পাড়া প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানো হয় পিঠাপুলি। ধান কাটা শেষে খালি মাঠ বা বাড়ির আঙ্গিনায় আয়োজিত হয় লাঠি খেলা, ষাাঁড়ের লড়াই, বাউল গানের আসর, মেলা কিংবা ওয়াজ মাহফিল। কিশোরদল মেতে ওঠে ফুটবল আর ক্রিকেট নিয়ে। চলে খানাপিনার ধুমধাম।এই হেমন্তে কাটা হবে ধান/আবার শূন্য গোলায়/জাগবে ফসলের বান…। বান এসেছে ফসলের। এখন গোলাভর্তি ধান। মরা কার্তিক গত হয়েছে। শুরু হয়েছে সমৃদ্ধির অগ্রহায়ণ।1413

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। বর্তমানে সারাবছরই কিছু না কিছু ফসল হয়। সনাতন মাড়াই প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। যন্ত্রযুগে প্রবেশ করেছে গ্রাম। এখন শহুরে মানসিকতার কাছে মার খাচ্ছে গ্রামীণ মূল্যবোধ। আধুনিকতার ঠমক আর অন্যের চর্চায় অভ্যস্ত বাঙালী নিজের অনেক কিছুই খুইয়েছে। বর্তমানে আগের মতো বিপুল আয়োজনে হয় না নবান্ন উৎসব। তবে ম্লান হয়ে যায়নি আনন্দ। আজ এতিহ্যবাহী আচার উৎসবে মাতবে বাঙালী। প্রাকৃতজনের জীবন ও লোক চেতনায় উদ্ভাসিত হবে নগর। রাজধানী শহর ঢাকায়ও থাকবে নবান্ন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। অসাম্প্রদায়িক উৎসবে যোগ দেবে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ। নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে নতুন প্রজন্ম।

নবান্ন মানে নতুন অন্ন। নতুন চালের রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবটি নবান্ন নামে পরিচিতি পায়। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এ উৎসব শুরু হয়। ইতিহাস বলে, হাজার-হাজার বছর আগে কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে। তখন থেকেই ঘরে ফসল তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর অন্যতম।

প্রতিবারের মতো এবারও অগ্রহায়ণের শুরুতে সোনার ফসলে ভরে উঠেছে কৃষকের জমি। হেমন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে খেলা করছে পাকা ধানের শীষ। আপন মনে হেলছে। দুলছে। দেখে মন ভরে যায়। সোনালি ফসলের দিকে তাকিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছেন কৃষক। ধান কাটার কাজও শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। লোককবির ভাষায় আইলো অঘ্রাণ খুশীতে নাচে প্রাণ/চাষি কাঁচিতে দিলো শান/কাঁচি হাতে কচ কচা কচ কাটে চাষি পাকা ধান…। নতুন এ ধান ঘরে তোলার পর আয়োজন করা হবে নবান্ন উৎসবের। বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড়সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হয়। বাকি অংশ চাল করে সে চালে পায়েস রান্না করা হয়।

আজ নবান্ন উৎসবের দিনে বাংলার কৃষকের ঘরে হরেক পদের রান্না হবে। এক সময় কুড়ি থেকে চল্লিশ পদের তরকারি করা হতো, তার কিছু হলেও দেখা যাবে আজ। তালিকায় থাকবে সব ধরনের শাক। ভর্তা, ভাজি। আর পিঠাপুলি ও পায়েসের কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এর শ্রেষ্ঠ সময়। ঘরে ঘরে পিঠাপুলি, পায়েস হবে। ধুম পড়বে নেমন্তন্ন খাওয়া ও খাওয়ানোর।

সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, নবান্ন উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতাও যোগ করা হয়। হিন্দুরা নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। পার্বণ বিধি অনুযায়ী হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। কে চায় অমন পাপ করতে!

অমুসলিম রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এ নৈবেদ্যকে বলে ‘কাকবলি’। অতীতে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। কাকবলির আগে আরও তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেÑ লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ ও বীরবাশ। বীরবাশের প্রথা মূলত বরিশাল অঞ্চলের। এর নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলী দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। এর পর গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোঁতা হয়। ওই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে বাঁধা হয় ধানের ছড়া। নবান্ন উৎসবে কাকবলি, লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ হয়ে গেলে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এর আগে কেউ কিছু মুখে নেন না। বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্রামে এখনও নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারও মহাআনন্দে উৎসব উদযাপন করবে বাংলার কৃষক। নতুন চালে পিঠাপুলির আয়োজন করা হবে। আছে আরও অনেক প্রাচীন রীতি। সেগুলো মেনেই হবে নবান্ন উৎসব। এখন বাংলার ঘরে ঘরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

নাগরিক জীবনে নতুন ধান বা চালের কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। রাজধানী শহর ঢাকায় বসে শুধু অনুভব করা যায়। শেকড় সন্ধানী মানুষ চিরায়ত ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে। ঘরে ঘরে উৎসব আয়োজনের সুযোগ নেই। তাই বলে খিল এঁটে কেউ ঘরে বসে থাকবেন এমন নয়। বরং শহরে-নগরে ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয় নবান্ন উৎসব। আজ মনের আনন্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন শেকড় সন্ধানী মানুষ। শহরজুড়ে থাকবে হরেক আনুষ্ঠানিকতা। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় উৎসবের স্বরূপটি তুলে ধরা হবে নাচ-গানসহ বর্ণাঢ্য পরিবেশনায়। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

রাজধানীতে বর্ণাঢ্য আয়োজন ॥ ঢাকায় প্রতিবারের মতোই মূল আয়োজনটি থাকছে চারুকলার বকুলতলায়। এখানে বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করবে জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। আজ সকাল ৭টা ১ মিনিটে নবান্ন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। উৎসব উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আয়োজকরা জানান, সঙ্গীত নৃত্য আবৃত্তিসহ নানা আয়োজনে বাংলার লোকজীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হবে। বেজে উঠবে বাংলার ঢাক-ঢোল। নবান্ন উৎসবের আরেকটি বর্ণিল ছবি দেখা যায় পাহাড়ী জনপদে। জুম চাষের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি উৎসবে তুলে ধরবেন আদিবাসী শিল্পীরা। বর্ণাঢ্য পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসবেন তারা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পিঠাপুলির মাধ্যমে আপ্যায়ন করা হবে আগতদের। থাকবে মুড়ি-মুড়কি আর বাতাসাও। প্রথম পর্ব শেষে সকাল ৯টায় নবান্ন শোভাযাত্রা বের করা হবে। দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রায় একই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আয়োজন করা হবে নবান্ন ও লোকজ মেলার। দুই দিনব্যাপী আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর। প্রথমবারের মতো উৎসবের আয়োজন করছে বাংলাদেশ ইয়ুথ এ্যান্ড স্টুডেন্টস ফোরাম ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট। নবান্ন উৎসবের দিন মঙ্গলবার সরব থাকবে ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবর মুক্তমঞ্চ। বেশকিছু সংগঠনের শিল্পীরা নাচ পরিবেশন করবেন। অংশগ্রহণ করবেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরাও।

সকল আয়োজন থেকে লোক-মানসের প্রচার ও প্রকাশ ঘটানো হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালী উৎসবে অংশ নেবেন বলে আশা আয়োজকদের।

সূত্র: জনকন্ঠ

Be Sociable, Share!
বিভাগ: কৃষি খবর, প্রধান খবর - ১

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*