শিরোনাম

ঘরের ভেতর কেবলই পোড়া কঙ্কাল

5b8ef3a2325f5ac93648de518d5a6a4a-59b051c372528নিজস্ব প্রতিবেদক: পুড়ে যাওয়া ঘরে কোনো মানুষের দেহ নেই। কয়লা হয়ে যাওয়া আসবাবগুলোর মাঝে কয়েকটি মাথার খুলি আর কিছু হাড়। নিজের মুঠোফোনে তোলা মিরপুরের জঙ্গি আস্তানার ভেতরের এ রকম চিত্রই দেখালেন এক র‍্যাব কর্মকর্তা। জানালেন, হাড়-খুলি গুনে তাঁরা সাতজন নিহত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। ছোট খুলি আর হাড়গুলো শিশুদের বলে বোঝা গেলেও বড়দের লাশ কোনটা কার সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই।

র‍্যাব বলছে, মঙ্গলবার রাতে মিরপুরের মাজার রোডের বর্ধনবাড়ি এলাকার ‘কমল প্রভা’ নামের বাড়িটির পাঁচতলায় যে বিস্ফোরণ ঘটে তা ছিল রাসায়নিক থেকে সৃষ্ট। বিস্ফোরণে পাঁচতলার মেঝে ও ছাদ পর্যন্ত ফুটো হয়ে গেছে। পুড়ে নিহত হয়েছেন ভেতরে থাকা সবাই। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আবদুল্লাহ, তাঁর দুই স্ত্রী ফাতিমা ও নাসরীন, দুই শিশুসন্তান ওসামা (১০) ও ওমর (৩) এবং আরও দুজন। বাকি দুজন আবদুল্লাহর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, আবদুল্লাহর আইপিএস কারখানার কর্মীদের মধ্যে একজনের নাম কামাল। আরেকজন কে তাঁরা তা চেনেন না।

জঙ্গি আস্তানা রয়েছে, এমন খবর পেয়ে মিরপুরের এই বাড়িটি গত সোমবার রাত ১১টায় র‍্যাব ঘেরাও করে। র‍্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা বাড়ির ভেতর থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সোমবার সন্ধ্যায় তাঁরা রাজিও হলেন। কিন্তু রাত ৯টা ৪৬ মিনিটে ওই ফ্ল্যাটে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। জঙ্গিরা এভাবে আত্মঘাতী হবেন, ঘটনার আগ পর্যন্ত বোঝা যায়নি।

রাসায়নিকের আগুনে পুড়ে কঙ্কাল

গতকাল বুধবার বেলা সোয়া তিনটার পরে র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার রাতে যে বিস্ফোরণটি ওই ফ্ল্যাটে ঘটেছে তা ছিল ভয়াবহ রাসায়নিক বিস্ফোরণ। সেখানে পেট্রল, অ্যাসিডসহ বোমা বানানোর জন্য যে রাসায়নিক মিশ্রণের প্রয়োজন হয় তার সবকিছুই সেখানে ছিল। সব মিলিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটায় জঙ্গিরা। তিনি বলেন, পাঁচতলা ফ্ল্যাটে যেখানে প্রধান বিস্ফোরণটি ঘটানো হয় সেই মেঝেতে চার বর্গফুটের একটি গর্ত তৈরি হয়ে গেছে। ওই গর্ত দিয়ে তরল রাসায়নিক নিচে গড়িয়ে চারতলার ফ্ল্যাটেও আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণের যে ভয়াবহতা ছিল তা আধা কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

বেনজীর আহমেদ বলেন, ওই ফ্ল্যাটে সাতটি খুলি পাওয়া গেছে। দেহগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখানে-ওখানে দু-একটি হাড় দেখা যায়। খুলি দেখেই সাতটি দেহ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর ডিএনএ নমুনা রাখা হবে। সেখানে আবদুল্লাহ, তাঁর দুই স্ত্রী, দুই সন্তান ও তাঁর দুজন কর্মচারী নিহত হয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি বলেন, র‍্যাবের চেষ্টা ছিল নিরপরাধ নারী ও শিশুদের বাঁচাতে। কিন্তু জঙ্গিদের খুনে মানসিকতার কাছে তাদের সন্তানও নিরাপদ নয়। এ ছাড়া আবদুল্লাহর খামারের অনেকগুলো কবুতর ওই বিস্ফোরণে মারা গেছে। আরও কতগুলো আহত হয়েছে। র‍্যাব সদস্যরা সে কবুতরগুলোকেও বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

এটা আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ছিল কি না, এই প্রশ্ন করা হলে র‍্যাবের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমি এ কথাটাকে এভাবে বলব, ওখানে যে জঙ্গি ছিল তিনি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। এবং এর ফলে তিনি নিজে, তাঁর স্ত্রী-সন্তান ও সম্ভবত তাঁর দুজন কর্মচারী নিহত হন।’ তিনি বলেন, গতকাল সকাল থেকে বাড়িতে তল্লাশি শুরু হয়। খুলিসহ অন্যান্য যে আলামত আছে সেগুলো সংগ্রহের জন্য র‍্যাব ও সিআইডির ফরেনসিক দল কাজ করছে। ভাড়াটেদের ঘরও তল্লাশি হবে। তিনি বলেন, ভবনের অবস্থা দেখে মনে হয় চার ও পাঁচতলা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি বসবাসযোগ্য কি না তা পরে প্রকৌশলীরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিস্মিত এলাকাবাসী

স্থানীয় লোকজন এ ঘটনায় বিস্মিত। আর দশজনের মতো সাধারণ জীবনযাপনকারী এলাকায় বিনয়ী ও ক্রীড়ামোদী হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ যে ভেতরে-ভেতরে এত দুর্ধর্ষ লোক হতে পারেন, তা সবারই ধারণার বাইরে। তাঁর দুটি শিশুসন্তানের জন্য প্রতিবেশীদের মন খারাপ। তবে স্থানীয় মুসল্লিরা বলছেন, আবদুল্লাহ আহলে হাদিস বা সালাফি মতের অনুসারী ছিলেন। মসজিদে বুকে হাত বেঁধে নামাজ পড়াসহ সালাফিদের ধর্মীয় অন্যান্য আচার পালন করতেন। জেএমবি বা নব্য জেএমবির মতো জঙ্গি সংগঠনের বেশির ভাগ সদস্য সালাফি মতাদর্শের অনুসারী। তবে জঙ্গিরা সাধারণত ঘর ছেড়ে যান, এক বাসায় বেশিদিন থাকেন না বা তাঁদের কাছে অপরিচিত লোকদের আনাগোনা থাকে। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে এ রকম ঘটনার কথাও স্মরণ করতে পারলেন না প্রতিবেশীরা।

ওই এলাকার আবদুল বারেক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০০০ সাল থেকে এ এলাকায় আছেন। তখন থেকেই তিনি আবদুল্লাহ আর তাঁর ভাই খোকাকে চেনেন। তখন থেকেই আবদুল্লাহরা এই বাড়িতে (কমল প্রভা) আছেন। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ বেশ আমুদে ও বিনয়ী ছিলেন। এ পাড়ায় তাঁর আইপিএস, ইউপিএস ও ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজারের ব্যবসা। দামি কবুতরও পালেন। এ জন্য কয়েকজন লোকও রাখা আছে।

স্থানীয় সাংসদ সাবিনা আক্তার (তুহিন) বলেন, তিনিও আবদুল্লাহকে চিনতেন। দেখা হলে আবদুল্লাহ তাঁকে সালাম দিতেন। কোনো দিন তাঁকে খারাপ বলার মতো কোনো কিছু ঘটেনি। তিনি বললেন, ‘ওর বাড়ির ভেতরে আসলে ও কী করত, তা তো আর কেউ বলতে পারে না। তবে আমার বাড়ির বুয়া বলেছে, ওর বাড়িতে একটা ঘরে নাকি কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হতো না।’

এখানকার আল মুজাহিদ স্টোরের ভেতরে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লির সঙ্গে। তাঁরা বলছিলেন, আবদুল্লাহ আহলে হাদিস মতের অনুসারে মসজিদে নামাজ পড়তেন। এটা সবাই জানতেন। তবে তাঁকে কখনো উগ্র মনে হয়নি। সম্প্রতি তাঁকে মসজিদে খুব বেশি একটা দেখা যাচ্ছিল না।

স্থানীয় তরুণ খোরশেদ আলম অনেক দিন ধরেই চেনেন আবদুল্লাহকে। খোরশেদসহ কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল গোলারটেক মাঠের কাছে। অন্য তরুণেরা জানালেন, আবদুল্লাহকে একটু কম চেনেন তাঁরা। তবে আবদুল্লাহর ভাই খোকাকে স্থানীয় ব্যক্তিরা সবাই চেনেন। আড্ডাবাজ, ক্রীড়ামোদি হিসেবে পরিচিত। খোকা আগে ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন, পরে লালকুঠি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছেন বলে তাঁরা শুনেছেন।

তামিম-সারোয়াররা ওই বাড়িতে ছিলেন

র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গতকাল বলেন, আবদুল্লাহ ২০০৫ থেকে জেএমবিতে যুক্ত হন। পরে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগ দেন। তাঁর এই বাড়িতে সারোয়ার জাহান, কানাডার নাগরিক জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজসহ অনেক বড় বড় জঙ্গি ঘুমিয়েছে। তিনি বলেন, জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের শুরা কমিটির এক সদস্য গত বছর র‍্যাবকে এই আবদুল্লাহর নাম বলেছিলেন।

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা তখন এ বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। জানতাম যে কোনো একটা আবদুল্লাহ আছে। আবদুল্লাহ ছিলেন সংগঠনের আনসার (সাহায্যকারী)। তিনি মূলত জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, অর্থসাহায্য, থাকার জায়গা এসব ঠিক করে দিতেন। এই বাড়িকে প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা হতো।’

Be Sociable, Share!
বিভাগ: প্রধান খবর - ১

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*