

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ নিয়ম ভেঙে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তিন সহকারী প্রকৌশলীকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) অথরাইজড অফিসার পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এ পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যে যোগ্যতা থাকা দরকার, তা তাদের নেই।
রাজউক কর্মকর্তারা জানান, রাজউকের অথরাইজড অফিসার পদে কাউকে দায়িত্ব দিতে হলে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী প্রকৌশলী হতে হবে। বেতন গ্রেড হতে হবে পঞ্চম। যাদের পদায়ন করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। পদবি সহকারী প্রকৌশলী। এ ছাড়া রাজউকে ১১ জন অথরাইজড অফিসার থাকলেও তাদের অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। তাদের পদায়ন না করে প্রেষণে নিয়োগের বিষয়টিও রহস্যজনক।
রাজউক নিয়োগবিধি–২০১৩ সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব)–কে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার পদে পদায়ন করা হয়েছে। গত ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাসমিন ফারহান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ পদায়ন করা হয়।
রাজউকের চাকুরি বিধিমালা–২০১৩ এর তফসিল [বিধি ২(৭)] অনুযায়ী অথরাইজড অফিসার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নিয়ম রয়েছে, ক) পদোন্নতি: সহকারী অথরাইজড অফিসার/সহকারী প্রকৌশলী/সহকারী স্থপতি হিসেবে অন্তত ৭ বছরের চাকরি।
খ) প্রেষণ: মন্ত্রণালয়ের অধীন নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), সহকারী প্রধান স্থপতি, উপ–স্থপতি অথবা উপ–নগর পরিকল্পনাবিদ। কিন্তু পদায়নকৃত তিনজনই ‘চলতি দায়িত্বের নির্বাহী প্রকৌশলী’ অর্থাৎ বাস্তবে সহকারী প্রকৌশলী, যাদের পেশনে রাজউকের অথরাইজড অফিসার পদে নিয়োগের বিধান নেই। ফলে এটি নিয়োগবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮ এপ্রিল ২০২৩-এর প্রজ্ঞাপন (নং: ২১–৯৭) অনুযায়ী চলতি দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে মেয়াদ নির্ধারণ বাধ্যতামূলক, যা সর্বোচ্চ ৬ মাস হতে পারে। কিন্তু রাজউকে পদায়নকৃত প্রকৌশলীদের চলতি দায়িত্বের প্রজ্ঞাপনে কোনো মেয়াদই উল্লেখ নেই। ফলে সরকারি চাকুরি বিধিমালার চলতি দায়িত্ব–সংক্রান্ত নিয়মও লঙ্ঘিত হয়েছে।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, এর আগেও মন্ত্রণালয় একইভাবে কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রেষণে রাজউকে পদায়ন করেছিল। তবে নিয়োগবিধির শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরবর্তীতে তাদের ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয় রাজউক। এ ছাড়া চলতি বছরের জুন মাসে চারজন নিজস্ব কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রদান (এমপাওয়ারমেন্ট) সংক্রান্ত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠায় রাজউক। কিন্তু মন্ত্রণালয় নির্ধারিত ছকে সকল অথরাইজড অফিসারের তথ্য চাইলেও তৎকালীন সদস্য (প্রশাসন) ড. মো. আলম মোস্তফা নিয়ম অনুসরণ না করে ‘মনগড়া প্রতিবেদন’ পাঠান।
এর পর তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই মন্ত্রণালয় ওই চার কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রত্যাহার করে তাদের প্রশাসন শাখায় বসিয়ে রাখে। দীর্ঘদিন কোনো দায়িত্ব না দিয়েই তারা অফিসে বসে নিয়মিত বেতন পেতে থাকেন। রাজউকে জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও একজন অথরাইজড অফিসারকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যা প্রশ্ন তুলেছে ভেতরের অনেক কর্মকর্তার মনে।
রাজউকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গণপূর্ত ও স্থাপত্য থেকে যারা পেষণে আসেন, তাদের অনেকে রাজউকের সেবা কার্যক্রম নয়, বরং আর্থিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেন। প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা পকেট ভরে চলে যান। আগে অনেককেই তাদের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিজস্ব নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সীমিত সক্ষমতা নিয়েও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রক্রিয়াগত কিছু ত্রুটি, নাগরিকের নিয়োজিত কারিগরি ব্যক্তিদের অবহেলা—এসবের দায় অন্যায়ভাবে রাজউককে বহন করতে হচ্ছে।
রাজউকের বোর্ড সদস্য (প্রশাসন) গিয়াস উদ্দিন বলেন, চিঠির বিষয়ে আমি এখনো অবগত নই, হাতে পাইনি। যেটি সম্পর্কে বলা হচ্ছে, তা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এছাড়া চেয়ারম্যান স্যার কাল অফিস করবেন; এই বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে জানা যাবে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো আদেশের খবর এখনো পাইনি। আদেশটি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
নিয়োগবিধি উপেক্ষা ও পূর্বের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন প্রকৌশলীকে অথরাইজড অফিসার পদে পদায়ন নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতা প্রত্যাহার, জনবল সংকট, এবং সেবা জটিলতা—সব মিলিয়ে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
আপনার মতামত লিখুন :