শিরোনাম

সৌদী আরবে দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের আহজারী

251661_187কুমিল্লা সংবাদদাতা : সৌদী আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় কুমিল্লার চান্দিনা ও বরুড়া উপজেলার তিন প্রবাসীর গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। কেউ সন্তান হারিয়ে, কেউ স্বামী হারিয়ে, কেউ বাবাকে হারিয়ে আবার কেউ বা আপনজনকে হারানোর বুকফাঁটা আর্ত্মনাদে ভারী হয়ে উঠেছে তাদের নিজ নিজ গ্রাম। পাড়া-প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনরা ছুটে আসছে তাদেরকে শান্তনা দিতে। কিন্তু কোন শান্তনাই যে তাদের আর্ত্মনাদ কে দমিয়ে রাখতে পারছে না!
মা-বাবা, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনদের অর্ত্মনাদ দেখে শান্তনা দিতে আসা এলাকাবাসীও তাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না।

বুধবার বিকেলে চান্দিনা উপজেলার বরকইট ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের নিহতদের বাড়িতে গেলে এমন হৃদয় বিদারক চিত্র দেখা যায়।
ওই গ্রামের আবুল বাসার । দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর যাবৎ সৌদী আরবে রয়েছেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পরও অস্বচ্ছল পরিবারকে স্বচ্ছল করতে ব্যর্থ হয়ে নিজের তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে কামাল হোসেনকেও সৌদী আরবে নিয়ে যান। বিধিবাম! অস্বচ্ছল আবুল বাসার এর স্বচ্ছলতার চাকা না ঘুরলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ভাগ্যের চাকা ঘুরে হারিয়েছেন নিজের বড় সন্তানকে!
ছেলেকে হারিয়ে পাথর প্রায় মা তাছলিমা বেগম। যাকে দেখছেন, তাকেই জড়িয়ে ধরে কামাল, কামালরে। বাপ আমার, কেই গেলিরি কামাল, এমন হৃদয় বিদারক কান্না করতে করতে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন।
নিহত মোহাম্মদ হোসেন (৩২) এর বাড়িতে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। পিতা সায়েদ আলীর মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্বপরে তাদের উপর। সাত বছর বয়সী কন্যা ঝুমা ও পাঁচ বছর বসয়ী কন্যা রুমানাকে নিয়ে পাথর প্রায় তার স্ত্রী কুলসুমা বেগম। শিশু রুমানা তেমন কিছু বুঝে না উঠলেও শিশু ঝুমা আব্বু আব্বু বলে কান্নায় চোখ ভাসাচ্ছে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারী সৌদী আরব পারি জমান পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় মোহাম্মদ হোসেন।
নিহত অপর জন সেলিম (৩৩) এর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বড় হাতুয়া গ্রামে। হাঁস-মুরগীর ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক এর দুই ছেলের মধ্যে বড় সেলিম। তার ছোট ভাই আব্দুল হালিম বাক প্রতিবন্দ্বি হওয়ায় পুরো সংসারের দায়িত্বভার কাঁধে নিয়ে ধার-দেনা করে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারী সৌদী আরবে যান তিনি। সংসারের ঘানিটানা থাক দূরের কথা ধার-দেনা পরিশোধ করার আগেই জীবন প্রদীপ নিভে গেছে এই পরিশ্রমী যুবকের।
নিহতের চাচাতো ভাই জয়নাল আবেদীন জানান, নিজের বসত ভিটি ছাড়া আর কোন সম্পদ নেই নিহত সেলিম এর পিতা আব্দুর রাজ্জাকের। প্রচুর ধার-দেনা করে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দারিদ্রতার কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। কিন্তু দারিদ্রতা তার পিছু ছাড়েনি। উপরন্তু দারিদ্রতার কালো থাবায় কেড়ে নিল তার একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে।
সেলিম বিদেশে যাওয়ার মাত্র ২ বছর পূর্বে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে ১৫ মাস বয়সী জমজ দুই সন্তান এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে তার। তার মৃত্যুর সাথে সাথে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পুরো পরিবার। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন তাও নেই তার পরিবারে কাছে।
এদিকে, ওই দুর্ঘটনায় আহত ৩ যুবকের মধ্যে এক যুবকের অবস্থা আশঙ্কা জনক। আহত যুবক শরীফ (২০)। চান্দিনার শ্রীমন্তপুর গ্রামের আমিন মেম্বারের ছেলে মেধাবী ছাত্র শরীফ। কুমিল্লা ইস্পাহানি স্কুল এন্ড কলেজ এর ছাত্র শরীফ পিতার পাহাড়সম ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে চলতি বছরের জানুয়ারীতে সৌদী আরব পারি জমান। ভাগ্যের সাথে যুদ্ধ করে সৌদী আরবে মোটামুটি ভালই কাজ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মঙ্গলবারের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ভাগ্যের চাকা থমকে যায় তার। মারাত্মক আহত হয়ে সৌদী আরবের দাম্মাম জেলার নারীয়া জেনারেল হসপিটালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন উদ্যোমী ওই যুবক।
তার সাথে এই হাসপাতালে আহতাবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন একই গ্রামের আবুল কাশেম এর ছেলে জাকির হোসেন (৩১) এবং বরুড়া উপজেলার বাতাইছড়ি গ্রামের আলমগীর হোসেন। তাদের মধ্যে আহত আলমগীর ওই হাসপাতালের নিরব পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ)তে চিকিৎসাধীন। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জ লড়ছেন আলমগীর।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে প্রাইভেটকার যোগে সৌদী আরবের দ্বীযানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পর হাফার আল বাতেন রোডের নারীয়া এলাকার পৌঁছার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এতে ঘটনা স্থলেই তিনজন নিহত হয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় শরীফ, জাকির ও আলমগীর নারীয়া জেনারেল হসপিটালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সৌদী আরব থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহত কামাল হোসেন এর পিতা আবুল বাসার।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: জেলার খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*