শিরোনাম

পাগলাপীরে মুসল্লি-পুলিশ সংঘর্ষ : কে এই নিহত হাবিব?

268266_178রংপুর সংবাদদাতা: ফেসবুক পোস্টের জেরে রংপুরের পাগলাপীরের ঠাকুরটারীতে মুসল্লি-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হাবিবুর রহমান হাবিব একজন ফুটপাথের চায়ের দোকানের কর্মচারী। রংপুর মহানগরীর মেডিক্যাল মোড়ে সেন্ট্রাল ক্লিনিক এলাকায় একটি ফুটপাথের চায়ের দোকানের কর্মচারী তিনি।

তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলেন না। তবে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদকে ভোট দিয়েছিলেন এই যুবক। শুক্রবার নাইট ডিউটিতে আসার সময় মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তার ছয় ও আড়াই বছরের দু’টি মেয়ে আছে। এ ঘটনায় তার অবুঝ দুই শিশু, স্ত্রী মোসলেমা, দুই ভাই, মা ও বাবা শোকে দিশেহারা হয়ে পড়লেও গত রোববার বিকেল পর্যন্ত তাদের খোঁজখবর নেয়নি কেউ। আশপাশের মানুষও এ ঘটনায় শোকাহত। তারা ক্ষুব্ধ। রোববার সরেজমিন গেলে নয়া দিগন্তের কাছে উঠে আসে এ তথ্য।

শলেয়াশাহ বাজারে ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করেন স্থানীয় নায়েব আলী। হাবিবুর রহমান প্রসঙ্গে তিনি জানান, লালচাঁদপুর গ্রামে বাড়ি হাবিবের। তার বাবা আবদুর রাজ্জাক ঢাকায় থাকেন বেশির ভাগ সময়। সেখানে কখনো রিকশা চালান, কখনো ফেরি করেন। তিন বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় হাবিব। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ হতে না হতেই শলেয়াশাহ বাজারে হাবিব পানের দোকান শুরু করেন। পানের দোকান থেকে তিনি দেন চায়ের দোকান। এর মধ্যে ধারদেনায় পড়ে তিনি ওই দোকান মমিনুর রহমানের কাছে বিক্রি করে দেন। রাস্তার উত্তর পাশে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান করেন তিনি। পরে সেখানে থেকে বৃষ্টি হোটেল নামে একটি খাবারের দোকান গত ঈদুল আজহায় চালু করেন বাজারের সামান্য পূর্বে মহাসড়কের উত্তর পাশে। কিন্তু দোকানে বাকি পড়ে যাওয়ায় চলে যান রংপুরে। রংপুরে মেডিক্যাল মোড়ে সেন্ট্রাল রোডের সামনের ফুটপাথের চায়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন হাবিব। শুক্রবারের বিক্ষোভের সময় মারা যান তিনি।

ওই ব্যবসায়ী জানান, হাবিবের দোকানে পান থেকে শুরু করে চা ও ভাত সব খেয়েছি। কিন্তু সে কখনই কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। এটি শলেয়াশাহ ও আশপাশের যেকোনো লোককে বললেই জানা যাবে। এমনকি ওই হাবিব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়েন না। তবে গত ইলেকশনে জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়েছিল বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
হাবিব জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়েছেন বিষয়টি কিভাবে জানলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আমি দীর্ঘ দিন হাবিবের দোকানে পান, চা, ভাত খাই। তার সাথে উঠবোস করেছিলাম। ভোটের সময় সেই উঠবোস থেকেই বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি।

লালচাঁদপুর গ্রামে ঢুকতেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন অন্তত ১০ জন কিশোরী, তরুণী ও নারী। পাশেই কবরের পাশে হু হু করে কাঁদছেন এক মহিলা। তার নাম শিমুল। তিনি হাবিবের বড় বোন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘আমার ভাইটার কিছু নাই। দুইটা অবুঝ ছাওয়া। বউটাও চেংরি বয়সে বিধবা হইলো। এখন ওদের কে খাওয়াবে। হামার ভাইটার জানাজাত মানুষ আইসে নাই আটক হওয়ার ভয়ে। পুলিশ আর পুলিশ। আল্লাহয় জানে হামার ভাইয়োক নাওয়ান ধোওয়ান করাইছে কি না।’

স্থানীয় আরেক মহিলার নাম নাজমা বেগম। তিনি কাঁদতে থাকলেন। আর বলতে থাকলেন, ‘সাত-আটজন মানুষ হইছিল জানাজায়। মানুষ গ্রেফতার হওয়ার ভয়োতে আইসে নাই। পুলিশ দিয়া ভরি গেছিল। অন্তত ৩০০ পুলিশ আসছিল বাবা। এই মহিলার অভিযোগ টিভিত দেখি খালি হিন্দুদের ভাঙচুর ও পুড়ি যাওয়া বাড়িঘর। সাংবাদিকরা আইসে আর আমাদের ছবি তুলি নিয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেখায় না। হামার দেবরের পুত্র মারা গেল। তার কি কোন বিচার নাই। তার পরিবার কেমন আছে কেউ তো দেইখতে আইসলো না।’

হাবিবের ভগ্নিপতি আনছারুল ইসলাম জানান, ‘এটি কেমন বিচার। আমরা বুঝি না। কারো বাড়ি ঘরোত আগুন লাগল। সেটা আপনারা টিভিত দেখাচ্ছেন। আর আমাদের একটা মানুষ মারা গেল। তার দুইটা শিশু বাচ্চা। স্ত্রী। মা-বাপ থাকল। তাদের কেউ খোছ নিলো না। তাদের কথা কোনো সাংবাদিকেরা লেখেন না, দেখানও না।’

হাবিবের বাবা আবদুর রাজ্জাক জানান, ‘আমি ঢাকায় রিকশা চালাই। হাবিব রংপুরে মেডিক্যাল মোড়ে ফুটপাথের চায়ের দোকানে কাজ করে মা, দুই ভাই ও দুই মেয়ের ভরণ-পোষণ করে। এ নিয়ে আমরা চলছিলাম। দুই দিন থেকে নাইট করছিল। সে কারণে দুপুরের পর বাড়ি থেকে বের হয়। শুক্রবার দোকান যাওয়ার জন্য বের হয়ে যায় হাবিব। পথে কোনো রিকশা-ভ্যান ছিল না। এ কারণে সেও মিছিলের সাথে সাথে যাচ্ছিল। এরপর গোলাগুলিতে পড়ল সে। মারা গেল। এখন শুনছি আমার পুত্র নাকি জামায়াত করে। সে কোনো দিনই কোনো রাজনীতি করে নাই। সে দিন আনে দিন খায়। সংসার চালায়। তবে আমি জাতীয় পার্টি ভালোবাসি।’

হাবিবের মা আমেনা খাতুন জানান, ‘আমি কিছুই বলব না। ছেলেটাকে ওরা মারিও ফেলল। আবার জানাজাত মানুষও আসতে দিলো না। এটা কেমন বিচার। আল্লাহ এর বিচার করবে। আমার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। ওই নামাজও পড়তে যায় না। টিভিত বলতেছে সেই ছেলে নাকি আমার জামায়াত করে। জামায়াত কি সেটাই আমরা জানি না।’
এ দিকে হাবিবের স্ত্রী মোসলেমা খাতুন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কোনোভাবেই কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। তার বড় মেয়ে বৃষ্টি কালো জামা পরে ফ্যাল ফ্যাল তাকাচ্ছিল সবার দিকে। আর ছোট মেয়ে আড়াই বছরের হাওয়া শুধু এদিক-ওদিক চাওয়াচাওয়ি করছিল।

রংপুর মহানগরীর মেডিক্যাল মোড়ের সেন্ট্রাল ক্লিনিকের সামনে ফুটপাথে খোকনের চায়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন হাবিবুর। ওই দোকানের ওপর কর্মচারী রবিউল ইসলামকে হাবিবের কথা বলতেই তার চোখ পানিতে টলমল হয়ে গেল। তিনি বললেন, হাবিব খুব সাদাসিধে ছিল। সে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না। বাড়ি থেকে আসত, কাজ করে চলে যেত। যে দিন নাইট থাকত, সেই দিন সে দুপুরের পর আসত। তাকে গুলি করে মারা হলো, বিষয়টি ভাবতেই পারছি না।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: জেলার খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*