শিরোনাম

কবির নিঃসঙ্গতায় সঙ্গ দেয় বিশ্ব

d6b1afe848e523e39323e84677bd2c2b-38নিজস্ব সংবাদদাতা: মেঘমেদুর এক অপরাহ্ণে সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মবার্ষিকীর দুই দিন আগে তাঁর গুলশানের বাড়িতে আমি। বলা ছিল জন্মদিন নিয়ে হবে কথাবার্তা। বাড়ির বারান্দার সোফায় বসার পর সরাসরি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, ‘মনে করুন, আজ ২৭ ডিসেম্বর, আপনার জন্মদিন। আর ওই যে দেখুন, শামসুর রাহমান হেঁটে হেঁটে আসছেন। এসে বসেছেন আপনার পাশে। তাঁকে আজ কী বলবেন?’
নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বললেন, ‘শামসুর রাহমান একটা কথা একটু দুষ্টুমি করে বলত, “কে যে হাতছানি দিল আর পথে বেরিয়ে পড়লাম, আর তো ফিরতে পারলাম না।” আমি এ কথার পুনরাবৃত্তি করে ওর হাত ধরে বলতাম, “আপনি তো ঘাসের তলায় মাটির সঙ্গে সখ্য করে আছেন আর আমি এখনো পথে। এবং এই পথটা বাংলার পথ। এই পথ মানুষের পথ। ইতিহাসের পথ। এ বড় ইতিহাসের নাটকীয় সময়ের মধ্য দিয়ে পথচলা। ভাঙিনি কখনো। বরং উত্তোলিত হয়েছি।”’
‘ওই যে দেখুন, আপনার অগ্রজেরাও এসেছেন আপনাকে কিছু বলতে। তাঁদের কী বলবেন?’
‘আমার একটা পরম সৌভাগ্য, আমার সেই সব মহান অগ্রজের অকৃপণ স্নেহ আমি পেয়েছি। তাঁরা আমাকে হাত ধরে পথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। জসীমউদ্‌দীন, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মুনীর চৌধুরী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শওকত ওসমান, ফররুখ আহমদ—কত কত জন। আজ একাশিতে পা রেখে তাঁদের দিকে ফিরি, নমিত হৃদয়ে আমি তাঁদের অভিবাদন করি।’
এবার সৈয়দ হক নিজেই বলেন, ‘হাসানের কথা ভুলে যাচ্ছ কেন? হাসান হাফিজুর রহমান। স্বপ্নবান এবং দূরের দিকে চোখ—এমন একটি মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। হাসান তাঁর একুশের কবিতায় বলেছিলেন, “ফেরাউনের ঔদ্ধত্যের শেষ কটি বছরের মুখোমুখি আমরা।” ৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উচ্চারিত তাঁর এই কথা। আর এর মাত্রই ১৮ বছর পরে সেই ফেরাউনের পতন আমরা দেখেছি।
‘আমার সমসময়ের কেউই প্রায় নেই। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আছে। শরীরটা ওর ভালো নয়। কিন্তু এখনো লিখছে। দূর লন্ডনে আছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। আর একজনাই আছেন—আনিসুজ্জামান—কত সভা-সমিতিতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। আমাদের ভিতরে কাউকে যদি মনীষী বলি, তবে আমি তাঁকেই শুধু পাই।’
‘কাইয়ুম চৌধুরী আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।’
‘কাইয়ুম আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। সাহিত্য–শিল্প ছাড়িয়ে যে বন্ধুত্বকে আমি রক্তের চেয়েও গাঢ় বলে জানি। আজ রাজনীতির ক্ষেত্রে নৌকার প্রতীক দেখি। কিন্তু আমরা দুজন সেই বায়ান্ন–তিপ্পান্ন সালে এই নৌকাকে আবিষ্কার করেছিলাম বুড়িগঙ্গার পাড় দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে, নৌকাকে আমরা ভেবেছিলাম যেন স্বপ্নতরি। জন্মদিনে কাইয়ুমের সঙ্গে বসে দুজনে মিলে নৌকার ছবি আঁকতাম।’
সৈয়দ শামসুল হকের এই রূপ দেখিনি কখনো আগে। অস্ফুট কণ্ঠে বলে চলেছেন, ‘নাহ্! কেউ নেই। আমি একা! কিন্তু আমার যে কাজ, সেটা একা মানুষেরই কাজ। কবির নিঃসঙ্গতার ভিতরে বিশ্ব সঙ্গ দেয়। তাঁর শূন্যতার ভিতরে সমস্ত বিশ্ব ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই আমি আজও আছি, লিখতে পারছি এবং লিখে যাচ্ছি।’

Be Sociable, Share!
বিভাগ: জাতীয় খবর, সাহিত্য

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*