শিরোনাম

অপসারণ হয়েছে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর দখল দূষণ রোধে সকল বাঁধা

inodiস্টাফ রিপোর্টার ॥ এবার অপসারণ হয়েছে নদীর দখল দূষণ রোধে সকল বাধা। ঢাকার চার নদী থেকে সকল প্রকার স্থাপনা ও দূষণরোধে আগেই হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। যেটুকু বাধা ছিল এবার তাও সোমবার আপীল বিভাগের রায়ে অপসারিত হয়েছে। আদালতের এক রায়ে ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর নাব্য রক্ষায় হাইকোর্টের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনায় জন্য পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। এর ফলে নদী দখল করে গড়ে তোলা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা উচ্ছেদে আর কোন বাধা রইল না।
এর আগেই আদালত তার এক রায়ে নদীর ভেতর থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা উচ্ছেদ রায় প্রদান করে। ঢাকার চার নদী রক্ষায় হাইকোর্টের দেয়া রায়ই বহাল থাকল। সোমবার প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগ হাইকোর্টের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনার আলাদা ৫ আবেদন খারিজের এ আদেশ দেন। ওই ৫ প্রতিষ্ঠান হলো- সিটি গ্রুপ, কামাল ভেজিটেবলস, মোল্লা সল্ট, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট এবং সিমেক্স সিমেন্ট। আপীল বিভাগের এ আদেশের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকে উচ্ছেদে আর কোন বাধা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।
জানা গেছে, পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) এক রিট আবেদনে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট ঢাকাকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগসহ আশপাশের নদীগুলোর নাব্য রক্ষায় রায় দেয়। পরে হাইকোর্ট রায় দেয়ার পর শীতলক্ষ্যা নদীর জায়গা দখল করে জেটি নির্মাণ অপসারণ করার জন্য সিটি গ্রুপ, কামাল ভেজিটেবল, মোল্লা সল্ট, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট এবং সিমেস্ক সিমেন্টকে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন নোটিস প্রেরণ করেন। প্রশাসনের এ নোটিসের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করলে ২০১০ সালের ২১ মার্চ তা খারিজ করে দেন আদালত। এর পর হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করলে ২০১০ সালের ৩ মে আপীল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আবেদনের নিষ্পত্তি করে দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ দায়ের করা হলে শুনানি শেষে আপীল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায়ের ফলে নদী দখলমুক্ত ও রক্ষার জন্য হাইকোর্টের রায় বহাল থাকল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে পাঁচ প্রতিষ্ঠান আপীল বিভাগে গেলেও তাদের আপীল খারিজ হয়ে যায়। বহাল থাকে হাইকোর্টের রায়ই। আদালতে এইচআরপিবির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, এ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এবং ওই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ছিলেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহমুদুল ইসলাম ও সৈয়দ আমিরুল ইসলাম।
ঢাকার চার নদী থেকে সব ধরনেন অবৈধ স্থাপনা ও দূষণমুক্ত করা ছিল জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু বার বার পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও কিছুইতেই ঢাকার চার নদী থেকে অবৈধ স্থাপনাকারীদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। ওই রিটে সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী এ্যাড মনজিল মোর্শেদ উল্লেখ করেন ঢাকা মহানগরীর চারপাশে নদী যথা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা- এই চার নদী দূষণ, অবৈধ দখল এবং নদীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে স্থাপনা নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
আদালতে রিট আবেদনের পেক্ষিতে সব পক্ষে শুনানি শেষে আদালত ২০০৯ সালের জুন মাসে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত সিদ্ধান্ত নেন যে ঢাকা মহানগরীর চারপাশে বুড়িগঙ্গা তুরাগ বালু প্রতিটি নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনক পরিমানেণ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে এই চারটি নদীই আগের চেয়ে অতিকায় শীর্ণকায় অবস্থায় পতিত হয়েছে। দখল দূষণ ছাড়াও এর অন্যতম কারণ হলো নদীগুলোর উৎসসমূহ সংরক্ষণ না করা। এতে উল্লেখ করা হয় ঢাকার সব নদী দখলের কারণে ভরাট হয়ে গেছে। প্রতিটি নদীর অভ্যন্তরে অবৈধ দখলদার বিভিন্ন বিভিন্ন প্রকার নদী দখল করে ভরাট, কাঁচা-পাকা স্থাপনা ভবনাদি, আবাসন প্রকল্প বালু ও ইটের ব্যবসা করছে। নদীর সীমানা ও কোন কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে বলতে পারে না। তবে বাদী-বিবাদী পক্ষ উভয়ই আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন যে সিএস ম্যাপ ও খতিয়ানে মূল নদীর পরিমাণ ও সীমানা দেখানো রয়েছে।
সবকিছু বিবেচনায় আদালত তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, নদীর ভেতর থেকে সব ধরনের দখল উচ্ছেদ অবিলম্বের করতে হবে। সিএস ও আরএস ম্যাপ অনুসারে নদীর সীমানা জরিপ করে সীমানা পিলার স্থাপন করতে হবে। নদীর পাড় বাঁধাই করে এর পাশ দিয়ে হাঁটার পথ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া নদীর তীরে বনায়ন করাসহ নদীর সকল প্রকার দূষণরোধকল্পে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আদালত তার রায় বাস্তবায়ন ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে সীমানা বেঁধে দিলেও তা আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
দীর্ঘদিন থেকেই নাগরিক মহলে ঢাকার নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করার জোর দাবি ছিল। কিন্তু কথায় কাজ হয়নি। অবশেষে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট চার নদীর সীমানা নির্ধারণ করে নদীর ভেতরের সব স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। কিন্তু নদী গ্রাসকারী কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আপীলের মাধ্যমে রায় বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। অবশেষে সোমবার আপীল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে সেই বাধাও অপসারিত হলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এখন আর নদীর এলাকা নদীকে ফিরিয়ে দিতে কোন বাধা বা ওজর-আপত্তি থাকবে না। তবে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে নদীকে মুক্ত করতে হলে সরকারকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা দেখাতে হবে। সেই কাজের আইনী শক্তি সরকারের রয়েছে।
আদালতের রায়ের পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এর পর আদালতের রায় বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে নদী দখল রোধে কিছু কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া নদীর সীমানা জরিপ করে সীমানা পিলার নির্মাণ করা হলে তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া সরকারের দুর্বলতার সুযোগে আবার নতুন করে বার বার নদী দখল করেছে দখলকারীরা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হাইকোর্টের রায়ের পর থেকে নদী রায় কিছু পদক্ষেপ নেয় সরকার। নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে জরিপ কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু নদীর সীমানা পিলার স্থাপন শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে আর অগ্রগতি দেখা যায়নি। এখন অনেক এলাকায় পিলার স্থাপন করা হয়নি। আবার অনেক এলাকায় পিলার স্থাপন করা হলেও আবার তা দখল হয়ে গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা নদী বিষয়ে আদালতের রায় বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এজন্য এখন উচ্ছেদ অভিযান চলছে। চলছে নদীর পাড় বাঁধার কাজ।
২০০৯ সালের ২৫ জুন দেয়া আদেশে রায় বান্তবায়নের জন্য ২০১০ সালের ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দেয়া আদালত। কিন্তু সে সময়ের মধ্যে সরকার রায় বাস্তবায়ন করতে না পারায় সময় বৃদ্ধির জন্য আদালতে আবেদন জানায়। এ আবেদনের পরিপেক্ষিতে নতুন করে সরকারকে বাড়তি ৬ মাস সময় দেয় হাইকোর্ট। সে সময়ও শেষ হয়েছে। কিন্তু রায় বাস্তবায়নের কাজ ততটা সম্পন্ন হয়নি। হাইকোর্টের রায় থাকা সত্ত্বেও ঢাকার চার নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ রায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছে রিট আবেদনকারী আইনজীবী।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই নোটিসে বলা হয়েছিল, আগামী সাত দিনের মধ্য এর জবাব না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট ঢাকার চার নদীর ভেতরের সকল স্থাপনা অপসারণ করাসহ নদী রায় কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। ওই রায়ের পর ঢাকার নদী দূষণমুক্ত হবে এমনটি আশা করা হলেও তার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। সর্বশেষ সোমবার আদালত তার রায়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন খারিজ করে দেয়ার পনরো নদীর ভেতর থেকের সব স্থাপনা উচ্ছেদের বাধার দূর হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখন দেখার বিষয় নদী দখলমুক্ত করতে সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: গ্রাম গঞ্জের খবর, জাতীয় খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*