

এম, এম, সাইফুর রহমান, চরভদ্রাসন, ফরিদপুরঃ ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা পারের বসতিরা গত দুই সপ্তাহ ধরে বরফ গলা কনকনে শীত, তুষারাচ্ছন্ন বাতাসে হাড় কাপুনি শীতের মধ্যে মানবেতর জীবন যাপন করে চলেছেন। উপজেলা পদ্মা পারের প্রায় পাঁচ হাজার ছিন্নমূল পরিবারের বসবাস। তীব্র শীতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মজুর ও শ্রমজীবী পরিবার গুলো। এ বছর সরকারি বা বেসরকারি ভাবে এক টুকরো কম্বল পায়নি বলে জানিয়েছেন শীতার্তরা। রাত পোহালেই তারা সূর্যের আশায় তাকিয়ে থাকেন আসমানের দিকে। এক ফালি সূর্য কিরণই যেন পদ্মা পারের বসতিদের এখন শীতের চাঁদর। কাঠ, খর জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা যায়।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, উপজেলার ভাঙ্গন কবলিত প্রায় ৫ হাজার পরিবার পদ্মা নদীর বিভিন্ন পার এলাকায়, বিভিন্ন বেড়িবাঁধে, রাস্তার ধারে,ও উন্মুক্ত ফসলী মাঠের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে আশ্রয়ন গড়ে বসবাস করে চলেছেন। এরা বেশীরভাগই শ্রমজীবি, মজুর ও জেলে পরিবার। শীত নিবারনের মত এক টুকরো গরম কাপড় কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। এ বছর উপজেলায় তীব্র শীত বিদ্যমান থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো শীতবস্ত্র বা কম্বল অনুদান পায়নি বলে জানিয়েছেন শীতার্তরা।
শনিবার দুপুরে উপজেলা সদর ইউনিয়নের হাজীডাঙ্গী গ্রামের পদ্মা পারের বসতি নূরজাহান বেগম (৫৮) রাস্তার ধারে মৃদু রোদ্রে বসে জানায়, এক সপ্তাহ পর একটু সূর্যের মুখ দেখেছি তাই নাতি নাতকুর নিয়ে রোদ পোহাচ্ছি। সে আরও জানায় শীতে এতো কষ্ট করলাম কিন্তু এ বছর আমাগো কেউ একটা কম্বলও দেয় নাই, আর কোনো চেয়ারম্যান মেম্বার আমাগো খবরও নিতে আসে নাই।
একই এলাকার সামচু শেখ (৫৫) বলেন, পদ্মা পারে বরফের মতো শীতে রাতভর পুলাপান লইয়্যা জটলাবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকি। দিনের বেলায় সূর্যের দেখা মিলে না। পদ্মা পারে বরফের গুড়ার মত বাতাস গায়ে এসে লাগে। শীতে জান বাঁচে না তাই মাঠে কাজ বন্ধ রাখছি। এখন পর্যন্ত কেউ একটা কম্বল দিয়েও আমাদের খবর নেয়নি।
একই দিন উপজেলার বালিয়া ড্ঙ্গাী গ্রামের পদ্মা পারের বসতি সাবেক ইউপি মেম্বার আঃ হক (৬০) বলেন এ বছর চেয়ারম্যান মেম্বাররা সরকারি ভাবে যেসব কম্বল বরাদ্ধ পেয়েছেন তার একটা কম্বলও দুস্থদের মাঝে বিতরন করে নাই। সবই স্বজনদের মাঝে লুটে দেওয়া হয়েছে। চরভদ্রাসন জেল খানার চারিদিকে বসবাস রত জোসনা আক্ত,শাহনাজ বেগম, জাহানারা বেগম এর দুই বোন এবং একটি মেয়ে এ বাড়িতে কোন পুরুষ সদস্য নেই অসহায় ভাবে চলছে এদের জীবন যাপন এরাও কোনো কম্বল পায়নি, এছাড়া এখানে বসবাসরত ছিন্নমূল পরিবারগুলো কোন কম্বল পায়নি। উপজেলা প্রশাসন আশ্রয়ন প্রকল্প ও বাজারে কিছু কম্বল বিতরণ করেছে বলে জানা যায়।
উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা অফিস সূত্রে জানা যায় এ বছর শীত মৌসুমে উপজেলায় মোট দুই হাজার চারশত দশ পিচ কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২শ’ পিচ করে চার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের হাতে ৮শ’ পিচ কম্বল দেওয়া হয়েছে। আর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ৩শ’ পিচ কম্বল নিজে ঘুরে ঘুরে বিতরন করেছেন।
অত্র উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক কম্বল বিতরনে অনিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জালাল উদ্দিন বলেন উপজেলায় আমি নতুন এসেছি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বাররা সঠিকভাবে কম্বল বিতরন করেছেন কি-না তা আমি খোঁজ নিয়ে ব্যাবস্থা নিবো।
আর উপজেলার গাজীরটেক ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী জানান, আমার ইউনিয়নে ২শ’ কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা বিতরনের জন্য ১২ জন মেম্বারদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
একই দিন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা পারের এক শিক্ষক বলেন, আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় কম্বল বরাদ্ধ অপ্রতুল একথা সত্য। কিন্তু এই তীব্র শীতে একটি কম্বল একজন দুস্থ শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। তাই যে টুকু বরাদ্দ সঠিক বিতরন হওয়া দরকার। কিন্তু উপজেলায় যাদের আছে ভুরি ভুরি, তারাই করলো দুঃস্থদের কম্বল চুরি।
আপনার মতামত লিখুন :