শিরোনাম

মহানবী সা:-এর আদর্শ ও আমাদের দায়িত্ব

273148_143নিজস্ব প্রতিবেদক: যত নবী আ: দুনিয়ায় এসেছিলেন, তাদের সবার একটিই কাজ ছিল মানুষকে ধর্মীয় দিকে থেকে মূর্তি পূজা, সামাজিক দিক থেকে জুলুম-শোষণ এবং রাজনৈতিক দিক থেকে মানুষের নেতৃত্ব ও প্রভুত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রভুত্বের অধীনে নিয়ে আসা। কারণ আল্লাহ ছাড়া মানুষকে প্রভু বানানো, আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্যের বিধান মতো চলা শিরক। রাসূল সা:-এর নেতৃত্ব ছাড়া অন্য মানুষের নেতৃত্বের অধীনে থাকা ভ্রষ্টতা। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রাসূলদের নিয়মমতো চলা ছেড়ে দিলে গুমরাহ হয়ে যাবে।’ মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির চেষ্টা করা, সব ভ্রান্ত মতবাদের ওপর ইসলামকে বিজয়ী করাই নবী জীবনের মিশন। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো- ইসলাম মানুষকে সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল সা: প্রদর্শিত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সব নবী আ: এ পথেই আমরণ প্রাণপণ জিহাদ চালিয়ে গেছেন। নবীগণ আ: এভাবে দায়িত্ব পালন করার কারণে সমসাময়িক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কায়েমি শক্তির সাথে তাঁদের যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত হয়েছে। নবীগণ আ: এভাবে দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাঁদের অনুসারীদের আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর আগমনি বার্তাও শুনিয়েছিলেন।

দুনিয়া যখন জাহিলিয়াতে ছেয়ে গিয়েছিল, তখন পৃথিবীর কেন্দ্র স্থান আরব ভূমিও অন্যায়-অবিচার আর বর্বরতায় পরিপূর্ণ ছিল। ঈসা নবীর আ: শিক্ষাও মানুষ ভুলে, খুনখারাবি, রাহাজানিসহ হাজারো অনাচারে নিমজ্জিত ছিল। এমন এক ক্রান্তিকালে পুরো দুনিয়ার হেদায়াতের জন্য আল্লাহ আমাদের নবী সা:-কে রাহমাতুল্লিল আলামিন করে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে, সারা বিশ্বের সব মানুষের ত্রাণকর্তাস্বরূপ পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ভূমি মক্কায় প্রেরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’। ৬৩ বছর নবুয়াতি দায়িত্ব সুনিপুণভাবে রাসূল সা: পালন শেষে তার অনুসারী এবং মুক্তিকামী, শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য বিরাট ইসলামি রাষ্ট্র এবং তার পরিচালনার জন্য কুরআন-সুন্নাহর সংবিধান ও গাইডলাইন রেখে, একাদশ হিজরি সনের ১২ রবিউল আওয়ালে উম্মতদের শোকসাগরে ভাসিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আর বলে যান, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ এই দুটিকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ তোমরা (সুখ, শান্তি ও জান্নাতের) পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তার একটি হলো- আল্লাহর কিতাব, অন্যটি হলো- আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ (আল হাদিস)। প্রিয় নবী সা:-এর কথামতো কুরআন-সুন্নাহকে সংবিধান ও গাইডলাইন হিসেবে গ্রহণ না করার কারণেই আজ মুসলিম বিশ্বে অশান্তি। জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ সা:-কে শাসক হিসেবে গ্রহণ করলে বিশ্ববাসী শান্তি পেতে পারে।’

প্রিয় নবী সা: কিভাবে ধর্মীয় কাজ সম্পাদন করেছেন, কিভাবে ইবাদতবন্দেগি করেছেন, সামাজিক বিষয় কিভাবে আনজাম দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে কী করেছেন এবং কী নির্দেশনা দিয়েছেন, তা জানা এবং মানা প্রতিটি উম্মতের জন্য ফরজ। সব ব্যাপারে প্রিয় নবী সা:-এর নীতিমালার বাস্তবায়নই মুসলমানদের কাছে নবী সা: দিবসের দাবি। এর উল্টা চলা, এর বিরোধিতা করা, এ পথে যারা চলে বা চলতে বলে, তাদের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। এই অবস্থায় প্রিয় নবী সা:-এর ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নীতিমালাকে সর্বস্তরে, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে মানবতার ইহকালীন সুখ শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করে, প্রিয় নবীর সা: নেতৃত্বকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তার রাসূলকে সা: প্রেরণ করেছেন সব ধর্ম, মতবাদের ওপর ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যদিও শিরককারীরা এটা পছন্দ করে না’ (সূরা ছফ, আয়াত নং-০৯)। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল সা:-এর জীবনে (সব ব্যাপারে) উত্তম আদর্শ আছে’। তিনি প্রিয় নবী সা:-কে আদেশ দিয়ে বলেন, হে নবী সা: আপনি তাদের বলে দেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন’(আল-কুরআন)।
মহান নবী সা: দিবসে মুসলমান, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ঈমানি দায়িত্ব হলো, প্রিয় নবী সা:-এর জীবনী আলোচনা করে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর গজব থেকে পাপ ও নাফরমানি থেকে নিজেরা বাঁচা এবং নিজেদের অধীনস্থ লোকজন ও জাতিকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।

মিয়ানমারে মজলুম মুসলমানসহ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের যে অবস্থা চলছে, তা আল্লাহর নাফরমানি এবং প্রিয় নবী সা:-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফল। এই ধরনের গজব থেকে আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে হেফাজত করুন, আমিন। নেতাদের দায়িত্ব হলো প্রিয় নবী সা:-এর নির্দেশমতো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর পথে চলা। মুসলমান হয়ে থাকলে, ঈমানি দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়া। পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, অফিসে, সমাজে ও দেশে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, সৎ কাজ চালু এবং অসৎ কাজ বন্ধ করাই নেতাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ (সূরা হজ, আয়াত নং-৪১)। এই নির্দেশ অমান্য করা বড় ধরনের পাপ। আল্লাহর বিধান ও প্রিয় নবী সা:-এর কথামতো চলা, জাতিকে পরিচালনা করাই নেতাদের দায়িত্ব। এটা সাম্প্রদায়িকতা, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের এবং ধর্ষণ, খুন, গুম ও নারী নির্যাতন বন্ধের পথ। এ পথে এলে নিজেরা শান্তি পাবেন, জাতিও শান্তি পাবে। আল্লাহর গজব ও আজাব থেকে সবাই বাঁচবে। আল্লাহর রহমত ও বরকতের দরজা খুলে যাবে। অন্যথায় জাতির সব পাপের জন্য আল্লাহর কাছে নেতারাই বেশি দায়ী হবেন। কারণ জনগণ নেতাদেরই বেশি মানে। আল্লাহর নবী সা:-এর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিধানমতো জনগণ যেন চলে, তা নিশ্চিত করা নেতাদের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘এলাকার লোকেরা যদি ঈমান এনে আল্লাহকে ভয় করে চলে, তাদের জন্য আসমান-জমিনের বরকতের সব দরজা খুলে দেবো।’

নেতারা যখন দুনিয়ায় সম্মানিত, আখিরাতেও যেন সম্মানিত থাকতে পারেন তার চিন্তা করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিল করা বিধানমতো শাসন ও হুকুম চালায় না, তারা কাফের (সূরা মায়েদা, আয়াত নং-৪৪)। কুফরি থেকে মুক্ত হওয়া সব মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহ আর বলেন, ‘যারা কুফরি করে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের উপর আল্লাহর লানত, ফেরেশতাদের লানত এবং সব অভিশাপ মানুষের লানত’ (সূরা বাকারা, আয়াত নং-১৬১)। পাপ ও কুফরির কারণে দেশে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অশান্তি হয় না, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যে বিপদ আসে, তাও পাপের ফল। নবী সা: দিবসে সবার উচিত নিজে পাপ থেকে বাঁচার এবং অধীনস্থকে পাপ থেকে বাঁচানোর শপথ নেয়া।

চিন্তার বিষয় হলো, জনগণ ধর্মীয় নেতাদের ওয়াজ শুনে কিন্তু নেতা ও কর্মকর্তারা চলে রাজনীতির হিসাবমতো। দেশ ও জাতি আল্লাহর বিধানমতো না চলার কারণে দেশে শরিয়তবিরোধী কাজ কত যে বেড়ে গেছে। জাতিকে বাঁচাতে হলে ধর্মীয় নেতারা আল্লাহর ওয়াস্তে ইত্তেহাদ মায়াল ইখলিলাফের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রিয় নবী সা:-এর প্রতিনিধি হিসেবে সর্বস্তরের মুসলমানকে বছরব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠান আয়োজন করে নবীজীকে জানা, মানা এবং প্রিয় নবী সা:-এর আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য উৎসাহিত ও সহযোগিতা করা ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব। আল্লাহর বিধান এবং প্রিয় নবী সা: প্রদত্ত রাজনীতি, বিচারনীতি, শাসননীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ও সংস্কৃতি ত্যাগ করার কারণেই দেশের এই দূরবস্থা। তা জনগণকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক নেতাদের বুজিয়ে বলা ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব। অন্যথায় ধর্মীয় নেতারা আল্লাহর আদালতে প্রধান আসামি হবেন। যদি শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, তাসবিহ-তাহলিল আর ইসলামি লেবাস সুরতের ফজিলতের বয়ান দেন, ইসলামবর্জিত শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচারনীতি ও শাসননীতি জাতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা না বলেন, তারা আল্লাহর নিকট কি জবাব দেবেন? আল্লাহ বলেন, ‘তার চাইতে বড় জালেম কে, তার কাছে থাকা আল্লাহর সাক্ষ্য গোপন করে যে’ (সূরা বাকারা, আয়াত নং-১৪০)। তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অল্প মূল্যের জন্য আল্লাহর কিতাবে নাজিল করা বিষয় গোপন করে, তারা পেটে জাহান্নামের আগুন ঢুকায়’ (সূরা বাকারা আয়াত নং-১৭৪)। নাউজুবিল্লাহ।

যদি নামাজ, রোজা, হজ, জাতাক, দাড়ি, টুপি, লেবাস, সুরত, জিকির-আসকার তাসবিহ-তাহলিলের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর বিধান মেনে চলেন, আর আল্লাহ প্রদত্ত, রাসূল সা: প্রদর্শিত ইসলামি সাংস্কৃতি ও রাজনীতি, কুরআনভিত্তিক শিক্ষানীতি, শাসননীতি ও বিচারনীতি এবং জাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি বাদ দিয়ে যদি এ সব ব্যাপারে অন্যদের বিধান মেনে চলেন, তাহলে আপনারা মুসলমান কি আসলেই হলেন? আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ইসলামকে পুরোপুরি মেনে চলো। আমি তোমাদের জন্য ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি। তোমরা কি কুরআনের কিছু মানবে, কিছু অমান্য করবে? যারা এমন করবে, তারা দুনিয়ায় লাঞ্ছিত হবে, পরকালে জাহান্নামের কঠিন আজাবে নিক্ষিপ্ত হবে।’ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের কথা মেনে চলো; তোমাদের আমল (নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দানখয়রাত) বরবাদ করিও না।’ আপনাদের উচিত, আপনাদের নিজেদের এবং বংশধরদের দুনিয়ার শান্তি এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের সাথে সাথে আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সা: প্রদর্শিত রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, শাসননীতি ও সংস্কৃতিকে নিজের নীতি হিসেবে গ্রহণ করা এবং নিজেদের বংশধরকে সেভাবে গড়ে তোলা। অন্যথায় যারা কিয়ামতের দিন আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমরা আমাদের মুরব্বি এবং নেতাদের কথামতো চলতাম। তারাই আমাদরে জাহান্নামি বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে বা যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে বিধান হিসেবে গ্রহণ ও কামনা করবে, তা (তাদের কোনো কিছুই) কবুল করা হবে না।’ মুসলমানদের উচিত, আল্লাহর দেয়া বিধান মতো চলা এবং নবী সা:-এর প্রদর্শিত ইসলামি রাজনীতিকে গ্রহণ করা। নামাজ আদায় করা, হালাল-হারাম মেনে চলা; পর্দা রক্ষা করা; অশ্লীলতা বন্ধ করা; শরিয়তের বিধান পালন করা। নিজেদের বংশধরদের সেভাবে গড়ে তোলা। প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘তোমাদের কেউ ঈমানদার হবে না, যদি আমি তার নিকট তার মাতা-পিতা, ছেলেমেয়ে এবং অন্য সব মানুষের চাইতে বেশি প্রিয় না হই।’

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*