শিরোনাম

বিচারক হিসেবে নবী করিম সা:

272852_12নিজস্ব প্রতিবেদক: আখলাকুন্নবী সা: বা নবীচরিত্র একটি সামগ্রিক বিষয়। বিচারকার্যে নবীর চরিত্র বা আখলাক তারই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজজীবন চালাতে গিয়ে তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ ও বিবাদ-বিসংবাদ ঘটতে পারে। এর ফলে যাতে কোনো রকম সামাজিক ধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নবী করিম সা: বিচারকাজেও তার অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন।

নবী করিম সা: বিচারক হওয়ার প্রকৃতি : পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী নবী করিম সা: কারো দ্বারা মনোনীত বিচারক ছিলেন না। তাঁকে বিচারক হিসেবে মনোনীত করেছিলেন স্বয়ং আহকামুল হাকিমিন আল্লাহ তায়ালা। আল কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘(হে নবী)! আমি সত্যসহকারে আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহর দেখানো মুক্তির আলোকে বিচার-আচার করতে পারেন’ (সূরা নিসা, ১০৫)।

‘(হে নবী!) বলুন, আমি আল্লাহর নাজিল করা কিতাবের ওপর ঈমান এনেছি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে’ (সূরা শুরা, ১৫)। ‘অতএব হে নবী, আপনার রবের কসম তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের ঝগড়াবিবাদে আপনাকে বিচারক মানবে এবং আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি মনে দ্বিধাসঙ্কোচ না রেখে সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নেবে’ (সূরা নিসা, ৬৫)। এসব আয়াতে কারিমা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ সা: স্বনিয়োজিত বা কারো দ্বারা নির্বাচিত বিচারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মহান আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক আর বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রিসালতের দায়িত্ব থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন ছিল না। তিনি রাসূল হিসেবে বিচারকও ছিলেন। রাসূলকে বিচারক হিসেবে না মানা মুমিনের কাজ নয়, বরং তা মুনাফিকের কাজ। আল কুরআনে বলা হয়েছে : ‘যখন তাদের বলা হয় আল্লাহর নাজিল করা কিতাব ও রাসূলের দিকে এসো, তখন দেখবে যে, মুনাফিকেরা তোমার থেকে কেটে পড়েছে’ (সূরা নিসা, ৬১)।

বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নীতিমালা : সুষ্ঠুভাবে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য বিচারককে অবশ্যই কতগুলো নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে নবী মুস্তাফা সা:। তিনি বিচারকাজে সর্বপ্রকার স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকতেন। তিনি বলতেন, আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে আমি নির্দ্বিধায় চুরির শাস্তি হিসেবে তার দু’হাত কেটে দেবো। তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে বিচারকাজ পরিচালনা করতেন, যাতে করে কোনো পক্ষের প্রতি অবিচার না হয়ে যায়।

হাদিস শরিফে এসেছে- হজরত আবু বকর রা: বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন : রাগান্বিত অবস্থায় যেন কোনো বিচারক দু’জন বিবদমানের মধ্যে বিচার ফায়সালা না করেন’ (বুখারি, মুসলিম)।
হজরত বুরাইদা রা: বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন- বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার জান্নাতি আর দুই প্রকার জাহান্নামি। জান্নাতে প্রবেশ করবেন তিনি যিনি সত্য অবগত হয়ে সে মোতাবেক বিচারকাজ পরিচালনা করেন, আর যে ব্যক্তি জেনেশুনে অন্যায় ফায়সালা দান করেন বা সত্য না জেনে আন্দাজের ওপর বিচারকার্য পরিচালনা করেন, তারা উভয়েই জাহান্নামি’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)।

‘বিচারকার্য পরিচালনার মূল ভিত্তি ও উপায়-উপকরণ হচ্ছে প্রথমত আল কুরআন, এরপর সুন্নাহ এবং সর্বশেষে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ ফায়সালা।’

হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: যখন তাকে ইয়েমেনে পাঠালেন, তখন বললেন, ‘কিভাবে তুমি বিচার-আচার করবে? মুয়াজ বললেন, আল কুরআনের ফায়সালা অনুসারে। হুজুর সা: বললেন, যদি ওই বিষয়ে আল কুরআনে কোনো ফায়সালা খুঁজে না পাও? মুয়াজ বললেন, সুন্নাহ দ্বারা। হুজুর সা: বললেন, যদি তাতেও না পাও? তিনি বললেন, আমার ইজতিহাদ দ্বারা এবং এতে কোনো প্রকার সঙ্কীর্ণতা দেখাব না। এরপর নবী করিম সা: হজরত মুয়াজের বুকে হাত রেখে বললেন, প্রশংসা সেই আল্লাহ তায়ালার যিনি তাঁর রাসূলের দূতকে এমন ক্ষমতা দান করলেন যাতে আল্লাহর রাসূল সন্তুষ্ট’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, দারেমি)। বিচার-আচার করার সময় বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষের কথাবার্তা যথাযথ শুনে এবং এর পক্ষে-বিপক্ষে সাক্ষী-প্রমাণ গ্রহণ করে ফায়সালা করা নবী করিম সা:-এর বিচারকার্যের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল।

হজরত আলী রা: বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সা: ইয়েমেনের বিচারক করে পাঠাতে চাইলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে পাঠাচ্ছেন, আমি একজন কম বয়সী মানুষ, বিচার-আচার সম্পর্কে আমার পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। হুজুর সা: বললেন, আল্লাহ তোমার অন্তরকে পথ দেখাবেন এবং তোমার জবানকে অবিচলিত রাখবেন। শোনো! যখন বিবদমান দু’জন লোক তোমার কাছে বিচার নিয়ে আসবে, তখন তুমি প্রথম ব্যক্তির কথা শুনেই তোমার রায় দিয়ে দেবে না, বরং উভয়ের কথা শুনে এরপর তা যাচাই-বাছাই করে ফায়সালা দেবে। হজরত আলী রা: বললেন, এরপর আমি কোনো ফায়সালা দিতে সন্দিহান হইনি (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজা)।

ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে বিচারকাজ পরিচালনা না করা সম্পর্কে নবী করিম সা: কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা একজন বিচারকের সাথে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ তিনি বিচারকাজে জুলুম-অত্যাচারের ঊর্ধ্বে থাকেন, যখন তিনি জুলুম ও বেইনসাফি করেন তখনই আল্লাহ তার থেকে পৃথক হয়ে যান এবং শয়তান এসে তার সাথী হয়ে যায়’ (তিরমিজি, ইবনে মাজা)। হজরত আয়েশা রা: রাসূলুল্লাহ সা: হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ন্যায়বিচারক কাজী কিয়ামতের দিন এই আকাক্সক্ষা করবেন যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে সামান্য খেজুরের ফায়সালাও যদি তাকে পৃথিবীতে না করতে হতো, তবে কতই না ভালো হতো (মুসনাদে আহমদ)।

উপসংহার : এ ধরনের ইনসাফ রাসূলুল্লাহ সা:-এর অনুপম বিচারনীতির নিদর্শন। তিনিই পৃথিবীতে রাসূল হিসেবে আল্লাহর তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ মনোনীত বিচারক ছিলেন এবং তাঁর প্রতিটি বিচারকাজ আমাদের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*