শিরোনাম

ব্যাংক ঋণের বিপরীতে উচ্চমাত্রার সুদহার কমানো হবে

4-Bank-400x300বিশেষ প্রতিনিধি ॥  ব্যাংক ঋণের বিপরীতে উচ্চমাত্রার সুদহার কমানো হবে। মূল্যস্ফীতির হার ও আমানতের ওপর প্রদেয় সুদ সমন্বয় করে ঋণের সুদহার কমানোর চিন্তা-ভাবনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া সুদহারের লাগাম টেনে ধরতে আগামী বাজেটে কর্পোরেট করের হারে বিশেষ কোন পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। বাড়ছে না আমানতের সুদের ওপর উৎসে কর। ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে আনতে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এবার দর কষাকষি নয়, বরং বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্দিষ্ট করে দেয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ সুদহার হতে পারে ১১-১২ শতাংশ পর্যন্ত। বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আগামী বাজেটেই সুদহার কমানোর দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা গেছে, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার কমিয়ে আনতে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নরকে একটি চিঠি দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর চিঠি পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে। এর আগে সুদহার কমিয়ে আনতে অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের মতামত গ্রহণ করেছেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সুদহার কমিয়ে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে লিখিত আকারে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ওই প্রস্তাবে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের মধ্যকার পার্থক্য বা স্প্রেড ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এফবিসিসিআই বলেছে, দেশে এখন এই স্প্রেডের হার ৫ শতাংশ। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়, সঞ্চিতির পরিমাণ, কর্পোরেট কর ও মুনাফা কমিয়ে আনলে স্প্রেডও কমবে, সুদহারও কমে আসবে।
এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দীন আহমেদ  বলেন, ব্যবসায়ীদের সুদহার কমিয়ে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে সুদ কমাতেই হবে। তবে সুদ কমাতে হলে আমানতের ওপর প্রদেয় সুদও কমিয়ে আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মেয়াদী ও চলতি মূলধনে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সুদ হার সবচেয়ে বেশি। উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ খরচ বাড়ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তাই ঋণের সুদ কমিয়ে আনার বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। এখন এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন সবচেয়ে বেশি জরুরী। আগামী বাজেটের আগেই সুদহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয়া হোক।
সূত্র মতে, ঋণের বিপরীতে উচ্চমাত্রার সুদহার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বর্তমান বড় বড় শিল্প খাতে মেয়াদী ঋণে ১৮-২১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে বেসরকারী খাতের ব্যাংকগুলো। তবে সুদহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে এখন অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বিএবি আন্তরিক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ঋণের সুদ কমলে শিল্প খাতে বিনিয়োগে যে ভাটা দেখা যাচ্ছে তা দূর হবে। উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে ঋণ পেলে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। আর তাই সরকারী উদ্যোগেই এবার সুদহার কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য উদ্যোক্তাদেরও দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। কিন্তু তাদের সেই দাবি পূরণ হয়নি। গত ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার জারি করে শিল্প খাতের ঋণের সুদ হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ ওই সময় একটি সার্কুলার জারি করে। তাতে বলা হয়েছিল, প্রি শিপমেন্ট রফতানি ঋণ ও কৃষি ঋণ ছাড়া অন্য খাতে ব্যাংক ঋণের ওপর সুদ হারের উর্ধসীমা প্রত্যাহার করা হলো। যদিও ২০১১ সালের মার্চ মাসে শিল্প খাতের ঋণের সুদ হারের ১৩ শতাংশ সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পর থেকে সুদ ও সার্ভিস চার্জ দ্রুত বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় দেশের কোন কোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৮-২১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ধার্য করে শিল্প ঋণ বিতরণ করছে। এই হারে সুদ নিয়ে যারা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশে সুদ হার ব্যবধান স্প্রেড দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায়, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, সুদহার, সার্ভিস চার্জ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণসহ সব ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ হারের সঙ্গে অতিরিক্ত কোন সার্ভিস চার্জ বা ফি না রাখার নির্দেশনা দিয়ে সার্কুলার জারি করলেও তা মানছে না বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ঋণের সুদ হারের পাশাপাশি ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি বাবদ ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরনের চার্জ নিচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের ১৮-২১ শতাংশ হারে সুদ গুণতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বলছেন, সুদের হারের লাগাম টেনে ধরতে সরকার ব্যর্থ হলে সার্বিক বিনিয়োগ ও নতুন শিল্প স্থাপন পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণে ব্যর্থ হবে বর্তমান সরকার।
মহাজনী কায়দায় সুদ আদায় ॥ শিল্প মালিকরা বলছেন, দেশে প্রাইভেট ব্যাংকগুলো মহাজনীয় কায়দায় সুদ আদায় করছে। মেয়াদী ঋণে ১৮-২১ শতাংশ সুদ হারে ঋণ বিতরণ, চক্রবৃদ্ধি হারে যা ২২-২৫ শতাংশে উন্নীত হয়। এর বাইরে ২৫ ধরনের সার্ভিস চার্জের নামে ঢালাও অর্থ আদায় গ্রাহকদের ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ব্যাংকের এমন অযাচিত অর্থ আদায়ের মাশুল দিচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিল্পোদ্যোক্তরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তথ্য মতে, দেশে দীর্ঘমেয়াদী মূলধনের ক্ষেত্রে সুদের হার ১৭-১৯ শতাংশ পর্যন্ত। আবার এর সঙ্গে যোগ হয় ২-৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ। এ ছাড়া মেয়াদ পূর্তির আগে ঋণ সমন্বয় করতে চাইলে কোন কোন ব্যাংক এ বাবদ অতিরিক্ত ৩-৪ শতাংশ হারে চার্জ আদায় করে থাকে। ফলে সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের ২৩-২৪ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এমনকি এশিয়ার অন্য দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এত বেশি নয়। ভারতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চীনে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ ও জাপানে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ মাত্র। অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নরকে দেয়া চিঠিতে আক্ষেপের সঙ্গে তাই লিখেছেন সুদের হার নির্ভর করে কস্ট অব ফান্ড এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খরচের মার্জিন, যে খাতে রিস্ক ফ্যাক্টর (ঝুঁকি) বিবেচনায় নেয়া হয়। অন্য দেশে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদের হারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দেশে তা মোটেই নেই। আমাদের লাভের প্রত্যাশা খুব বেশি, নিতান্তই লোভী। এ থেকে বেরোনোর কী উপায়? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মৌলিক গবেষণামূলক তত্ত্ব চাই। কী করে একটি সর্বজনগৃহীত ব্যাংক রেটে (সুদহারে) পৌঁছা যায়? কী করে তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হারের সমন্বয়ে সুদের হার বানানো যায়? আমি বলব, তারা (বাংলাদেশ ব্যাংক) একটি সমীক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
বাজেটে কর্পোরেট কর হার বাড়ানো হচ্ছে না ॥ ব্যাংক সুদ কমাতে আসছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক, বীমা ও অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর্পোরেট কর হার বাড়ানো হচ্ছে না। এর আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে এসব ক্ষেত্রে কর্পোরেট কর বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছিল। বর্তমান ব্যাংক, বীমা ও অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ কর্পোরেট কর প্রদান করছে। এ ছাড়া আমানতের সুদের ওপরও উৎসে কর বাড়ছে না। গ্রাহকদের মূল আমানতের ওপর কোন উৎসে কর কর্তন করা হবে না। তবে টিআইএন থাকলে ১০ এবং না থাকলে আমানতের সুদের ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হবে। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যে কোন গ্রাহকের হিসাবে সুদ প্রদানকালে সুদ গ্রহীতার টিআইএন না থাকলে সুদের ওপর ১০ এর পরিবর্তে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করার বিধান করা হয়েছে।
আমানতের সুদহার সমন্বয় করা হচ্ছে ॥ ব্যাংক মালিকরা বলছেন, সরকারের সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ, ব্যাংকের মুনাফার ওপর অতিরিক্ত কর্পোরেট ট্যাক্স, পুঁজিবাজারের ওঠানামা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংক অতিরিক্ত সুদ আরোপ করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে আমানতের সুদহার ১৩ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। এটা কমাতে হবে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ার‌্যমান হিসেবে কাজী আকরাম উদ্দীন আহমেদ জনকণ্ঠকে জানান, সরকার সঞ্চয়পত্র, বন্ডসহ বিভিন্ন নামে উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ করেছে। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকারী ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বেসরকারী খাতের ব্যাংকগুলো উচ্চহারের সুদ দিয়ে আমানত নিচ্ছে। ব্যাংকি খাতে চলছে অসম প্রতিযোগিতা। তবে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার ফলে এখন আমানতের সুদহার কমিয়ে আনা গেছে। তবে আরও কমতে হবে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে সুদ হার কমতে বাধ্য। সুদ হার কমাতে হলে মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। এখন মূল্যস্ফীতি কমে ৭ শতাংশ হওয়ায় ১১-১২ শতাংশে মেয়াদী ঋণ দেয়া সম্ভব। তিনি বলেন, আমানতের সুদহারও কমছে। বাজারে যে পরিমাণ তারল্য আছে তাতে কেউ ১১ শতাংশের বেশি সুদ দিয়ে আমানত নিবে না।
জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির গড় হার ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সেখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেয়াদী ঋণের সুদহার ১৮-২৪ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ কোন কোন ব্যাংক মূল্যস্ফীতির তিন গুণ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্প্রেড ৫ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও কয়েকটি ব্যাংকের স্প্রেড এখনও ওপরে রয়েছে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: অর্থনীতি, প্রধান খবর - ১

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*