শিরোনাম

ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অর্থসঙ্কটের আশঙ্কা

263124_129নিজস্ব প্রতিবেদক: আমানত বাড়লে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ে। আর বিনিযোগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে। সহায়ক হয় কাক্সিত হারে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে এ আমানতের প্রবৃদ্ধি।

ব্যাংক ব্যবস্থায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে নেমেছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে, যেখানে জুনে এ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে মেয়াদি আমানতে। আর জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে প্রবৃদ্ধি কমে নেমেছে শূন্য শতাংশে।
ব্যাংকে আমানতের প্রকৃত সুদহার শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় সাধারণ ব্যাংকে নতুন করে আমানত রাখার প্রবণতা কমে গেছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে যাবে। আর এতে ব্যাংকের নতুন করে টাকার সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে গ্রাহকদের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তার সাড়ে ১৯ টাকা বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে ১৩ টাকা সম্পদ দিয়ে যা ব্যাংকিং ভাষায় এসএলআর বলা হয়। আর সাড়ে ৬ টাকা নগদে রাখা হয়, যাকে সিআরআর বলা হয়। অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সাড়ে ৮০ টাকা বিনিয়োগ করতে পারে ব্যাংক। তাই সাধারণত আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হয়। ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ দেয় তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হলে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে যায়। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিলে তা শিল্পকারখানা স্থাপন, পণ্য উৎপাদন প্রভৃতির মাধ্যমে টাকার হাতবদল হয় বেশি হারে। কিন্তু ঋণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হলে অর্থাৎ টাকা পাচার হলে বা ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হলে টাকার হাতবদল হয় না। এতে বাড়ে না আমানতের প্রবৃদ্ধি। ব্যাংকে দেখা যায় টাকার সঙ্কট। যেমনটা ঘটেছিল ২০০৯ ও ২০১০ সালে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৭ শতাংশ। বিপরীতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৯ শতাংশ। এর পরের বছরে অর্থাৎ ২০১০ সালে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সাড়ে ২৮ শতাংশ। বিপরীতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সাড়ে ২১ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছরে ব্যাংক থেকে ুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) নামে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এর বেশির ভাগই শেয়ারবাজারে চলে গিয়েছিল। এর ফলে ওই বছরে ব্যাংকিং খাতে প্রচণ্ড টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। টাকার সঙ্কট মেটাতে ব্যাংকগুলো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অধিক সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করেছিল। যার রেশ ছিল পরের দুই বছরে (২০১১ ও ২০১২ সালে)। ২০১১ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি আগের বছর থেকে কমে হয় ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশে। ২০১২ সালে তা আরো কমে হয় ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ।
২০১৩ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ নামলেও ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে হয় সাড়ে ৭ শতাংশ। কিন্তু ২০১৪ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে হয় ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ; কিন্তু ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় প্রায় ১৪ শতাংশ। গত দুই বছর ধরে একই হারে বাড়ছে ঋণের প্রবৃদ্ধি। কিন্তু আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ব্যাংকে আমানতের গড় সুদহার কমতে কমতে এখন ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এ হিসাব গত আগস্টের। ওই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যদিও সেপ্টেম্বরে তা আরো বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। শুধু মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত আমানতের সুদহার এখন ঋণাত্মক।

অন্য দিকে সরকার সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছে জনগণের কাছ থেকে।ব্যাংকের আমানতের সুদহার তলানিতে নেমে যাওয়ায় আমানতকারীরা ব্যাংকে অর্থ রাখতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। অধিক মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করছেন সঞ্চয়পত্রে। কিন্তু কেউ কেউ আবার সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি অধিক মুনাফার জন্য পুঁজিবাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে। কিন্তু অন্য দিকে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৭ শতাংশ।

প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা থাকলেও এটি হচ্ছে উল্টো, যা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হচ্ছে তা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। ঋণের অর্থ হয় হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে, না হয় গ্রাহক ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছে। অর্থাৎ সঠিক কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঋণ সঠিক কাজে ব্যবহার না হওয়ায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আর আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমে যাচ্ছে।

ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান, মেঘনা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন গতকাল এ বিষয়ে আজকেরবিডি টোয়েন্টিফোরকে জানিয়েছেন, দুই তিন মাস ধরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বেড়েছে। বেড়েছে লেনদেন। সেই সাথে সঞ্চয়পত্রের সুদহার এখনো অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় ব্যাংকের বিনিয়োগ চাহিদা তুলনামূলক কম রয়েছে। বিনিয়োগযোগ্য তহবিল উদ্বৃত্ত থাকায় ব্যাংকও আগের মতো আমানত সংগ্রহ করছে না। এতে আমানতের সুদহার একটু বেশিই কমে গেছে। ফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমানতকারীদের ওপর। অনেকটা মানসিকভাবে আমানতকারীরা স্থিরই করেছেন, ব্যাংকে টাকা রাখলে মুনাফা কম পাওয়া যায়। এ কারণে তারা ব্যাংকে আমানত না রেখে পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্রসহ অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংক তারল্য সঙ্কটে ভুগবে কি না এ বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ এ এমডি জানান, তাতো হতেই পারে।

এবং এমন আশঙ্কা থেকেই যাবে। তিনি মনে করেন, বেশি সুদে আমানত নিলে বর্তমানে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাবে। এ কারণেই সুদহার বাড়ছে না। তবে বিনিয়োগ চাহিদা বেড়ে গেলে ও আমানতের সঙ্কট হলে ব্যাংকগুলো আবারো আমানত সংগ্রহে উৎসাহিত হবে। তখন সুদহার বাড়ানো ছাড়া ব্যাংকগুলোর সামনে আর বিকল্প থাকবে না।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: অর্থনীতি

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*