শিরোনাম

ঋণ খেলাপির পেছনে ব্যাংক ও ব্যাংকাররা দায়ী : অর্থমন্ত্রী

247312_145নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে ঋণ খেলাপি সৃষ্টির পিছনে ব্যাংক ও ব্যাংকাররা দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
তিনি বলেছেন, ব্যাংকারদের ধারণা সৃষ্টি হয়, ব্যাটাকে (গ্রাহক) যে করেই হোক ডিফলটার বানাতেই হবে। তাই গ্রাহকদের ঋণখেলাপি বানাতে ব্যাংক এবং ব্যাংকাররাই বেশি দায়ী। একজন গ্রাহক প্রথমে যখন ঋণ নিতে আসেন তখনই তাকে নিজের কব্জায় আনতে খেলাপি করানোর চিন্তা করেন ব্যাংকাররা। আমাদের দেশের ব্যাংক খাতের জন্য এটি খুবই খারাপ সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে মেনে চলা উচিত। সেটি হলো গ্রাহককে জানা (কেওয়াইসি)। গ্রাহককে চেন। এটি মেনে চললেই অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

আজ শনিবার সিরডাপ মিলনায়তনে অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আয়োজিত ‘রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে অবস্থা : চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায় শীর্ষক’ এক কর্মশালায় একথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, যখন একজন গ্রাহককে ঋণ দেয়া হয় তখন থেকেই ব্যাংকিং সিস্টেমে একটি ধারণা চালু হয়ে যায় এ ব্যাটাকে যে করেই হোক ডিফলটার বানাতে হবে। এর জন্য ব্যাংকাররা যা যা করার সবই করেন। এক সময় ওই গ্রাহক খেলাপি হয়ে যায়। এভাবে ভালো ভালো প্রকল্পে ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু ঋণটা এমনভাবে দেয়া হয় যেন গ্রাহক খেলাপি হয়ে যান। প্রত্যেক ব্যাংকারই এটা চান। কেননা ওই ব্যাংকার মনে করে খেলাপি হলে গ্রাহক আমার কব্জার মধ্যে চলে আসবে। এটা (ব্যাংকারদের) সবার পরিহার করা দরকার।

হলামার্ক, বিসবিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংকে ঋণ দেয়ার নামে হরিলুট পরিস্থিতি যার সময় সংঘটিত হয়েছে, সেই অর্থমন্ত্রী মুহিত অনুষ্ঠানো আরো বলেন, দেশে একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়া মানে শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় না। সেটা হয় পুরো ব্যাংক খাতের এমন কি পুরো অর্থনীতির সমস্যা। তবে আশার দিক হচ্ছে, এ দেশে স্বাধীনতার পর কোনো ব্যাংকই (লাটে উঠেনি) দেউলিয়া হয়নি। স্বাধীনতার আগে দেউলিয়া হয়েছিল কমরেড ব্যাংক (ইস্পাহানি গ্রুপের)। ওই ব্যাংক লাটে উঠার পর আর কোনো ব্যাংক কিন্তু লাটে উঠেনি। আমরা এ খাতটিকে মোটামুটি ভালোভাবেই চালাচ্ছি।

কমরেড ব্যাংক লাটে উঠায় তার নিজেরও ১৪০ টাকা লোকসান হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান। মুল প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন তিনি।

বিশেষ অতিথি ছিলেন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রণায়ল সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক, অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এতে রাষ্ট্রয়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের ব্যবস্থপনা পরিচালক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারের সাবেক ও বর্তমান সচিবরা এবং ব্যাংক ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, হলমার্ক এবং বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। ২০১১ সালে ঘটনা জানার পরও প্রায় দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যখন সোনালী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙ্গে দিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েছে তখন ওই পর্ষদের মেয়াদ ছিল মাত্র সাত দিন। এ ঘটনার সাথে আরো ২৬টি ব্যাংক জড়িত ছিল। সে ব্যাপারেও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

তারা আরো বলেন, রাজশাহী কৃষি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে একীভুত করা জরুরি। একইভাবে অগ্রণী এবং রুপালী ব্যাংককেই একীভুত করা জরুরি বলে বক্তারা মতামত তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে খরচ অনেকাংশে কমে আসবে।
বক্তরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন তলানীতে ঠেকে যাওয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এজন্য পর্ষদে কাদেরকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়ে আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কেননা যখন কোথাও কোনো ব্যাংকে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটে তার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদ। ফলে এ দুটি জায়গাকে ঠিক করতে পারলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যেমন বেসিক ব্যাংকের বেলায় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ থাকাও সত্বেও ব্যাংকটির ওই সময়ের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সেটি সরকারের জন্য যেমন দুর্ভাগ্যজনক তেমনি ব্যাংক খাতের জন্যও ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
বলা হয়, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ২৭ শতাংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের। এটি খুব লজ্জার বিষয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকের এমডিরা কেন খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারেন না সে প্রশ্নও তোলা হয়। কোনো এমডি খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে তাকে চাকরিচ্যুত করার দাবি জানানো হয়। কেননা একজন এমডি চার লাখ টাকা বেতন নিয়ে যান। অথচ খেলাপি ঋণ আদায় না করে বছরের পর বছর তিনি স্বপদে বহাল থাকেন এটা কোনোভাবেই হতে পারে না।

এম এ মান্নান বলেন, ব্যাংকের মূলধন পূনর্ভনের বিষয়ে-যেখানে চুরি হয়েছে সেখানে বার বার টাকা দেন কেন? আমাদের প্রায়ই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মধ্যে সামান্য বিরোধ থাকতে পারে। সেটি মিটিয়ে ফেলতে হবে। গ্রাহক ঋণ নিয়ে কি করেছে সেটা বিচার না করে ঋণের অর্থ ফেরত এসেছে কি না সেদিকে নজর দিতে হবে।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মূল কথা হচ্ছে ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব প্রকট। এটাকে বাড়াতে হবে। আর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে ব্যাংকের এমডিদের। কোনো বিষয় ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। প্রতিটি কেস হেড অফিস পর্যন্ত না এনে স্থানীয় পর্যায়ে নিস্পত্তি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ইউনুসুর রহমান তার মুল প্রবন্ধে ব্যাংকগুলোর সার্বিক আর্থিক অবস্থার বিবরণ তুলে ধরেন। এতে খেলাপি, ঋণ আদায়, বিতরণ, জনবল, জনসেবা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কাজের সীমাবদ্ধতা, আমানত, ঋণ প্রদান, সুদের হার এবং অন্য বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর সাথে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সার্বিক কার্যক্রম ও সেবার মানের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন।

এতে বলা হয়, গত চার বছরের জাতীয় বাজেট থেকে এসব ব্যাংকে সরকার নয় হাজার ৬৩৯ কোটি টাকার মূলধন যোগান দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকাই দেয়া হয়েছে সোনালী এবং বেসিক ব্যাংককে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপিই সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক। প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। শুধু তাই নয় এই ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিকভাবে মুনাফার পরিমাণ কমেছে টানা চার বছর। এমন কি রূপালী, বেসিক, রাকাব এবং বিকেবি সর্বশেষ গত বছর লোকসান গুনেছে।

ঋন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে দুদকের পক্ষ থেকে সাত দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না-সে বিষয়ে মনিটরিং বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেবার মানের বিষয়ে গ্রাহকদের সাথে কথা বলে কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে প্রবন্ধে। এতে বলা ১৭টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: অর্থনীতি, প্রধান খবর - ২

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*