শিরোনাম

ধনী-দরিদ্রের অসম ব্যবস্থার পূঞ্জিভূত সংকটে শিল্প নগরী শিকাগো থেকে মহান মে দিবস

ধনী-দরিদ্রের অসম ব্যবস্থার পূঞ্জিভূত সংকটে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বারবার কেঁপে উঠছে। গ্রীসের অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্রান্সের ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল ষ্ট্রীটে সাম্প্রতিক কালে ওকুপাই মূভমেন্ট বিশ্ব পুজিবাদী সংকট খোলাসা হয়ে উঠেছে। অষ্টাদম শতকে আমিরিকায় শিল্পায়নের ব্যাপকতা প্রসারে শিল্প মালিকেরা তাদেরই শ্রমিকদের সাথে যে মানবিক আচরণ করা দরকার ছিল  তা না করে শুধুমাত্র অতি মুনাফার দ্বারা তাড়িত হয়ে এক অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। ইতিহাসে জানা যায় ঐ সময়ে প্রাপ্য মজুরী, কথা বলার অধিকার থেকে শ্রমিকেরা বঞ্চিত ছিল। দীর্ঘ কর্ম-ঘন্টার চাপে শ্রমিকেরা ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। শ্রম পরিবেশ বলতে তখন কিছুই ছিল না, শ্রমিকদের প্রতি নিষ্ঠুর ও বর্বরহতো আচরণ করা হত, যা শ্রমিকরা তখন সহ্য করতে বা মেনে নিতে পারেনি। may dibos

পরিণতিতে শ্রমিকেরা সারা আমেরিকার বিভিন্ন শিল্প নগরীর কল-কারখানায় শ্রেণী বিদ্বেষের বিস্ফোরণ ঘটায় ১৮৮৬ সালে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। বামপন্থী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল শিল্প নগরী শিকাগো শহরে এই আন্দোলনের ব্যাপকতা কারখানা মালিকদের দাম্ভিকতার শক্তি এবং আমেরিকার প্রশাসনকে ধুমড়ে-মুচড়ে দেয়। শিল্পায়নের যুগে এত বিশাল ব্যপ্তি নিয়ে দুনিয়া কাপাঁনো শ্রমিক বিদ্রোহ এটাই ছিল প্রথম। যার কারণে এই ঘটনা ইতিহাসে অম্লান এবং কালজয়ী হয়ে উঠলো। শুধু তাই নয় মে দিবসের আন্দোলনের ব্যপ্তি নানা দিক দিয়ে এর বিস্তার ঘটে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র মে-দিবসকে মর্যাদার সঙ্গে পালন করে থাকে। এছাড়াও রুশ বিপ্লব সহ প্রতিটি শ্রমিক অভূত্থানের মধ্য দিয়ে মে-দিবসের তাৎপর্যকে আরও বিশাল করে তোলে।

প্রসঙ্গত ঃ ১৮২৫-৩০ সালের শুরুতে শিল্পায়নের যুগে ইংল্যান্ডের শ্রমিকরা তাদের দুঃখ-কষ্ট, বেকারত্বের যন্ত্রণার জন্য শিল্প-কারখানার মেশিনকে দায়ী করত। যার কারণে ঐ সময়ে শ্রমিকেরা কারখানার মেশিন ভাংচুর এমনকি মালিকদের হত্যা ও আঘাত করতো যা ইতিহাসে লোডাইট মুভমেন্ট নামে খ্যাত।

পরবর্তিতে ১৮৩০-৫০ সাল পর্যন্ত চার্টিষ্ট মূভমেন্ট চলাকালীন শ্রমিকরা দলবদ্ধভাদবে তাদের দাবীগুলো মালিক পক্ষকে জানাতে শুরু করে কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিকের সঙ্গে মালিক কর্তৃপক্ষের এক সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হত না। যার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রেখে শিল্পে উৎপাদন ব্যবস্থাকে উন্নত করার প্রয়োজনেই শ্রমিকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি বা ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এই ট্রেড ইউনিয়ন মালিক এবং শ্রমিকদের মধ্যে একটি সেতু বন্ধনস তৈরী করেছিল। শ্রমিকদের দাবী আদায় ও সমস্যা সমাধান হত এবং মালিকদের শিল্প কারখানাও ভালোভাবে চলত।

১৯১৯ সালে আই.এল. ও(International Labour Organization) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৪৬ সালে জাতি সংঘের সহায়ক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আই.এল ও এর ৭টি মৌলিক কনভেনশন সহ ৩৩টি কনভেনশন স্বীকৃতি প্রদান করে। যার মধ্যেConvention (87) Freedom of Association and Protection of the right to Organize. Ges Convention (98) right to Organization and collection Bargaining সংগঠন করার স্বাধীনতা, কথা বলার অধিকার এবং দরকষাকষি স্বাধীনতা অন্যতম। এ সকল কনভেনশন আমাদের দেশে সঠিকভাবে অনুধাবন এবং এর বাস্তবায়ন হলে শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠন এবং মালিক পক্ষ ও শিল্পায়নের পরিবেশ আরো উন্নত হওয়ার কথা। এখানে উল্লেখ্য স্বাধীনতা পূর্ব তদানিস্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাট, সুতা, বস্ত্রকল সহ শিল্প কারখানায় গঠিত ট্রেড ইউনিয়নের কালেক্টিভ বার্গেনিং প্রতিনিধি হিসেবে যেভাবে অতুলনীয় ভূমিকা পালন এবং এর পাশাপাশি আইয়ুব শাহীর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সমূহ এক গৌরভ উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। ঐ সময়ের ট্রেড ইউনিয়ন সমুহের ভূমিকার কথা শুনলে বুক ভরে যায় এবং চোখে জল আসে। দুঃখ জনক হলেও সত্য স্বাধীনতা পরবর্তিতে বিশেষভাবে সামরিক শাসন আমলে রাজনৈতিক শাসকদল ক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্বার্থে এগুলোকে ব্যবহার করে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ক্রমশঃ শক্তিহীন করে তোলে এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়নের চরিত্রগুলো নষ্ট করে সুবিধাবাদের জন্ম দেয়। এই সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে যখন একের পর এর জাতীয়করণকৃত কল-কারখানাগুলো বন্ধ হতে থাকে তখন এর দায় বর্তানো হয় ট্রেড ইউনিয়নের উপর।

প্রকৃত অর্থে ঐ সময়কালীন ট্রেড ইউনিয়ন ঘটনা প্রবাহে যে নেতিবাচক চিত্র সৃষ্টি করা হয়েছিল যার কুফল এখনো বাংলাদেশের শ্রমিক পরিবেশে কালো ছায়ার মতো প্রভাব ফেলে চলেছে। সরকারী বিভিন্ন সংস্থা এনজিও মালিকপক্ষ সহ সংশ্লিষ্ট অনেক বুদ্ধিজীবী ট্রেড ইউনিয়নের প্রসঙ্গে এই সমকালীন ঘটনাগুলো এমনভাবে টেনে আনেন যেন ট্রেড ইউনিয়ন সকল সর্বনাশের মূল কারণ। এই ধরনের মনোভাব পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবী রাখে।

অপ্রীতিকর হলেও সত্য যে, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং গ্লোবালাইজেশনের প্রেক্ষাপটের বাস্তবতার কারণে শিল্পে স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষেই এখন ট্রেড ইউনিয়ন এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশী করে দেখা দিয়েছে। বিশিষ্ট জনেরা মনে করেন যদি দেশে সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়ন থাকতো বা করতে দেওয়া হতো তাহলে পোশাক শিল্পের এর ধরনের শ্রম অসন্তোষ অনেকাংশে কমে যেত।

সামগ্রীকভাবে দেশের অভ্যন্তরীন সম্পদের প্রভূত উন্নতি এবং জি.ডি.পি তে প্রবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমূখী হলেও সম্পদের ব্যবস্থাপনার ব্যবধানের সূচক এখন ভারসাম্যহীন অবস্থা অতিক্রম করছে, সমাজ বিজ্ঞানের তত্ত্বে এটি একটি ঝুকিপূর্ন অবস্থা। এক্ষেত্রে বাস্তব সত্য হলো এই যে, ধনী-দরিদ্রের অসম ব্যবস্থার ব্যবধানের পরিধি পোষাক শিল্প অতিতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। যার কারণে রপ্তানীতে এ শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার যেমন উচ্চ শিখরে গৌরবের দাবিদার ঠিক তেমনি এই শিল্পের ভূখা-নাঙ্গা শ্রমিকদের অসন্তোষ বিদ্রোহ প্রায়ই মালিকদের স্বপ্নচুড়া তছনছ করে দিয়ে চলেছে, যা অনেক সময় সারা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

একজন অভাবী ও ক্ষুধার্থ শ্রমিক সর্ব্বেচ্চ উৎপাদন দিতে পারে না। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা যেমন প্রয়োজন ঠিক তেমনি শ্রমজীবিদের মৌলিক প্রয়োজনীয় চাহিদা যেমন খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান সমূহ এবং কর্মস্থলে জীবনের নিরাপত্তা প্রদান করাও একান্ত প্রয়োজন। সাধারণত শ্রমিকের দাবী-দাওয়াগুলো দুই ভাগে ভাগ করা যায় একটি মজুরী সংক্রান্ত আর অন্যটি চাকুরীর শর্তাবলী। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের মজুরী পরিবর্ধনে চাহিদা দেখা দেয়, বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে যথাসময়ে মজুরী বৃদ্ধি না করলে-শ্রমিকদের কাছে ন্যূনতম অর্থহীন হয়ে পড়ে। চাকুরীর নিয়োগ থেকে অবসান পর্যন্ত শ্রমিক পক্ষের নানা অভিযোগ অনুযোগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এ সকল সমস্যাদি মালিক পক্ষের সঙ্গে একেক জন শ্রমিক আলাদা আলাদা ভাবে মিমাংসা করা সম্ভব নয়। এজন্যই শিল্প-কারখানায় মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক উন্নয়নে আপোস-মিমাংসার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন-ই হচ্ছে গণতান্ত্রিক পন্থা ।

পোষাক শিল্পের ক্ষেত্রে মূলত: নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগ বা সমস্যা সমাধান করার ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ না থাকার কারণেই শ্রমিকেরা বাঁচার প্রয়োজনে নিজেদের দাবী আদায় রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, বিদ্রোহ করে।

ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বন্ধ রেখে শুধু কথা বলে শ্রমিক অধিকার আদায় করা যাবে না। মহান মে দিবসের প্রতি সম্মান দিয়ে সর্বক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবী। ##

ismail

এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল
সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস্ শ্রমিক ফেডারেশন- কেন্দ্রীয় কমিটি ।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: অতিথি কলাম, প্রধান খবর - ২

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*